ডারউইনে ইতিহাসের হাতছানি বাংলাদেশের সামনে। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথমবার টেস্ট জয়ের স্বপ্ন দেখছে টাইগাররা। তৃতীয় দিনের শেষ বিকেলে স্বাগতিকদের আরও ৪টি উইকেট তুলে নিয়ে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতেই রেখেছে টাইগাররা।
দিনের খেলা শেষে অস্ট্রেলিয়ার সংগ্রহ ৪ উইকেটে ১৬১ রান। এখনো বাংলাদেশের প্রথম ইনিংসের চেয়ে ৬৭ রানে পিছিয়ে তারা। হাতে আছে ৬ উইকেট। ফলে শেষ দুই দিনে অস্ট্রেলিয়াকে দ্রুত গুটিয়ে দিয়ে নিজেদের সামনে সহজ লক্ষ্য নির্ধারণের বড় চ্যালেঞ্জ বাংলাদেশের বোলারদের সামনে। প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশ লিড নিয়েছিল ২২৮ রানের।
দিন শেষে ক্রিজে আছেন ক্যামেরন গ্রিন ও অ্যালেক্স ক্যারে। গ্রিন ৮৬ বলে ৪৩ রানে অপরাজিত, ক্যারি ৫০ বলে করেছেন ১৯ রান। তবে অস্ট্রেলিয়ার আশা-ভরসার বড় জায়গা স্টিভেন স্মিথকে ফিরিয়ে দিয়ে বাংলাদেশ যে চাপ তৈরি করেছে, সেটিই দিন শেষে সবচেয়ে বড় স্বস্তির কারণ।
তৃতীয় দিনে বাংলাদেশের জয়ের স্বপ্নকে আরও জোরালো করে তুলেছেন অলরাউন্ডার মেহেদী হাসান মিরাজ। নিজেদের ইনিংসের শেষ মুহূর্তে ব্যাট হাতে গুরুত্বপূর্ণ ৬৫ রান করার পর বল হাতে তুলে নিয়েছেন অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে বড় ব্যাটিং স্তম্ভ স্টিভেন স্মিথের উইকেট।
ম্যাচের এমন অবস্থায় বাংলাদেশ এখন তাকিয়ে চতুর্থ দিনের দিকে। অস্ট্রেলিয়ার হাতে আছে ছয় উইকেট। দ্রুত তাদের অলআউট করতে পারলে জয়ের জন্য প্রয়োজনীয় রান তাড়া করে ইতিহাস গড়ার সুযোগ তৈরি হবে নাজমুল হোসেন শান্তর দলের সামনে।
বড় ট্রাম্প কার্ডটি খেলে দিলেন মিরাজ
অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় ইনিংসে শুরু থেকেই চাপ তৈরি করেছিল বাংলাদেশের বোলিং। প্রথম ইনিংসের সবচেয়ে সফল বোলার হাসান মাহমুদ দ্বিতীয় ইনিংসের শুরুতেই আতঙ্ক ছড়ান অস্ট্রেলিয়া শিবিরে। তিনি ফিরিয়ে দেন দুই ওপেনার ট্রাভিস হেড এবং জ্যাক ওয়েদারল্যান্ডকে।
তবে হাসান মাহমুদ দুই ওপেনারকে বোল্ড করলেও দিনের একেবারে শেষভাগে ট্রাম্প কার্ডটি খেলে দেন স্পিনার মেহেদী হাসান মিরাজ। তার শিকার স্টিভেন স্মিথের উইকেট। প্রথম ইনিংসে ৭১ রান করা স্মিথ ২য় ইনিংসে আউট হলেন ৪৪ রান করে। ‘ফ্যাব ফোরে’র অন্যতম ভয়ঙ্কর ব্যাটার স্মিথের উইকেটটিই তৃতীয় দিনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হয়ে ওঠে।
মার্নাস লাবুশেনের পর ক্রিজে এসে স্মিথ বেশ সাবলীলভাবেই এগোচ্ছিলেন। অস্ট্রেলিয়ার স্কোর তখন ১২২, ওই সময় পপিং ক্রিজের বেশ পেছন থেকে বল করেন মিরাজ। বলটি সামনের দিকে আসতেই স্মিথ ব্যাট বাড়িয়ে খেলতে যান। কিন্তু বল লিডিং এজ হয়ে সোজা মিরাজের কাছেই ফিরে আসে। দুর্দান্ত রিটার্ন ক্যাচ নিয়ে স্মিথকে ফিরিয়ে দেন মিরাজ। সঙ্গে সঙ্গে উল্লাসে মেতে ওঠেন বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা। ৪৪ রানেই থামতে হয় অস্ট্রেলিয়ার অন্যতম সেরা এই ব্যাটারকে।
স্মিথের উইকেটের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের জয়ের সম্ভাবনাও যেন আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। কারণ অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় ইনিংসের অন্যতম প্রধান ভরসা ছিলেন তিনিই। এর আগে লাবুশেনও বেশিক্ষণ টিকতে পারেননি। ৩১ রান করার পর আরেক স্পিনার তাইজুল ইসলামের সোজা বলে ব্যাট চালাতে গিয়ে বোল্ড হন তিনি।
শুরুতেই আতঙ্ক ছড়াতে থাকেন হাসান মাহমুদ
অস্ট্রেলিয়াকে দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নামার পর শুরুতেই অস্ট্রেলিয়া শিবিরে ভয় ধরিয়ে দেন হাসান মাহমুদ। প্রথম ইনিংসে ক্যারিয়ারসেরা ৬ উইকেট নেওয়া এই পেসার দ্বিতীয় ইনিংসেও দুই ওপেনারকে ফিরিয়ে দেন সরাসরি বোল্ড করে।
জ্যাক ওয়েদারাল্ড ও ট্রাভিস হেড- দুজনকেই একইভাবে বোল্ড করেন হাসান। প্রথমে ওয়েদারাল্ডকে শূন্য রানে ফিরিয়ে দেন। এরপর ১৭ রান করা হেডও ব্যাটের কানা লাগিয়ে নিজের স্টাম্পে বল টেনে আনেন।
হাসান মাহমুদের বোলিং দেখে বিস্মিত কিংবদন্তি অস্ট্রেলীয় উইকেটরক্ষক-ব্যাটার অ্যাডাম গিলক্রিস্ট। ওয়েদারল্যান্ডকে যেভাবে বোল্ড করেছেন হাসান, তা দেখে বিস্ময় লুকিয়ে রাখতে পারেননি গিলক্রিস্ট। অকপটে বলে দিলেন, ‘এমন দৃশ্য এর আগে আমি কখনো দেখিনি।’
হাসানের এমন বোলিংয়ে পাওয়ারপ্লের মধ্যেই অস্ট্রেলিয়া ৩ উইকেট হারিয়ে বসে। পরে লাবুশেন ও স্মিথ কিছুটা প্রতিরোধ গড়লেও সেটি বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি।
বাংলাদেশের প্রথম ইনিংসে শেষের নায়ক মিরাজ
শুধু বল হাতে নয়, ব্যাট হাতেও বাংলাদেশের এই টেস্টে অন্যতম নায়ক মেহেদী হাসান মিরাজ। বাংলাদেশের প্রথম ইনিংসের শেষ দিকে একাই অস্ট্রেলিয়ার বোলারদের হতাশ করেছেন তিনি।
বাংলাদেশ ৩৫১ রানে ৬ উইকেট নিয়ে তৃতীয় দিনের খেলা শুরু করেছিল। অস্ট্রেলিয়ার পেসার জশ হ্যাজেজলউড শুরুতেই বাংলাদেশের লোয়ার অর্ডারে আঘাত হানেন। মনে হচ্ছিল দ্রুতই বাংলাদেশের ইনিংস শেষ করে ফেলবে স্বাগতিকরা।
কিন্তু মিরাজ ছিলেন অন্য পরিকল্পনায়। লোয়ার অর্ডারের ব্যাটারদের আগলে রেখে একপ্রান্ত ধরে লড়াই চালিয়ে যান তিনি। তার ব্যাটে আসে মূল্যবান ৬৫ রান।
জশ হ্যাজলউডের বলে অ্যালেক্স ক্যারের হাতে ক্যাচ দিয়ে মিরাজ যখন ফিরলেন, তখন বাংলাদেশের সংগ্রহ ৪১৮ রান। শেষ পর্যন্ত ৪২৬ রানে থামে টাইগারদের ইনিংস।
৩০০ উইকেটের মাইলফলকে হ্যাজেলউড
অস্ট্রেলিয়ার হয়ে বল হাতে সবচেয়ে সফল ছিলেন জশ হ্যাজলউড। বাংলাদেশের প্রথম ইনিংসে ৬ উইকেট নিয়ে তিনি একাই ধস নামান সফরকারীদের ব্যাটিংয়ে। মিরাজকে ফেরানোর উইকেটটি ছিল হ্যাজলউডের টেস্ট ক্যারিয়ারের ৩০০তম। এরপর ইবাদত হোসেনকে ফিরিয়ে ৩০১ উইকেট পূর্ণ করেন তিনি। অস্ট্রেলিয়ার ৯ম বোলার হিসেবে ৩০০’র মাইলফলকে পৌঁছান তিনি।
বাংলাদেশের ইনিংসের শেষদিকে তাইজুল ইসলামও ১৭ রান করেন। হ্যাজেলউডের ২৯৯তম শিকার হন তিনি। এরপর মিরাজ ও ইবাদতকে ফিরিয়ে অস্ট্রেলিয়ার পেসার নিজের মাইলফলক পূর্ণ করেন। দিন শেষে ৬ উইকেট নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার সেরা বোলার ছিলেন হ্যাজেলউড। তার বোলিং ফিগার ৬/৮৯।
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথম জয়ের অপেক্ষা
বাংলাদেশ এখনো অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট জিততে পারেনি। ২০০৩ সালে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে গিয়ে ২টি টেস্ট খেলেছিল টাইগাররা। সেবার গো-হারা হেরেছিল খালেদ মাহমুদ সুজনের দল। ২৩ বছর পর সেই অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে গিয়ে তৃতীয়বারের চেষ্টায় জয়ের অপেক্ষার অবসান ঘটানোর দারুণ সুযোগ তৈরি হয়েছে।
ম্যাচের আগে অবশ্য বেশিরভাগ ক্রিকেটপ্রেমী ও বিশ্লেষকের হিসাব ছিল ভিন্ন। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে স্বাগতিকদের বিপক্ষে বাংলাদেশের কাজ যে কঠিন হবে, সেটিই ছিল স্বাভাবিক প্রত্যাশা। তার ওপর একমাত্র প্রস্তুতি ম্যাচে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া একাদশের কাছে বড় ব্যবধানে হেরেছিল বাংলাদেশ।
কিন্তু মূল ম্যাচে সম্পূর্ণ ভিন্ন চেহারায় দেখা গেছে টাইগারদের। প্রথমে অস্ট্রেলিয়াকে মাত্র ১৯৮ রানে গুটিয়ে দেওয়া, এরপর ব্যাট হাতে দীর্ঘ সময় উইকেটে পড়ে থেকে, ১৩৮ ওভার ব্যাটিং করে ৪২৬ রান করা- সব মিলিয়ে দারুণ আত্মবিশ্বাসী ক্রিকেট খেলছে বাংলাদেশ।
‘ফল নয়, প্রক্রিয়াতেই নজর’
তৃতীয় দিন শেষে বাংলাদেশের অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত দলের মানসিকতার প্রশংসা করেছেন। তার মতে, গত দুই-তিন দিনে দল যেভাবে লড়াই করেছে, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
ফক্স স্পোর্টসকে শান্ত বলেন, ‘আমরা যেভাবে চরিত্র দেখিয়েছি এবং গত দুই-তিন দিন যেভাবে খেলেছি, তা অসাধারণ। আমরা এক সেশন করে এগোচ্ছি, প্রক্রিয়ায় মনোযোগ দিচ্ছি, ফলাফলে নয়।’
এখন সেই প্রক্রিয়ার শেষ ধাপটি সফল করার অপেক্ষা বাংলাদেশের। অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় ইনিংসে হাতে থাকা ছয় উইকেট দ্রুত তুলে নিতে পারলে ম্যাচের সমীকরণ পুরোপুরি বাংলাদেশের পক্ষে চলে আসবে।
তবে ডারউইনের উইকেট ব্যাটিংয়ের জন্য ভালো। তাই ক্যামেরন গ্রিন ও অ্যালেক্স ক্যারের জুটি ভাঙার পাশাপাশি পরের ব্যাটারদেরও দ্রুত ফিরিয়ে দিতে হবে টাইগার বোলারদের।
তৃতীয় দিন শেষে তাই বাংলাদেশের সামনে ইতিহাসের দরজা খোলা। মিরাজের ঘূর্ণিতে স্মিথের পতন সেই দরজায় যেন আরও জোরে কড়া নাড়ছে। এখন চতুর্থ দিনে সেই দরজা খুলে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথম টেস্ট জয়ের ইতিহাস লিখতে পারে কি না বাংলাদেশ- সেটিই দেখার অপেক্ষা।
