রমজান শুরু হলেই কি কবরের আজাব বন্ধ হয়ে যায়?

 

রমজান মাস ইবাদত, রহমত ও মাগফিরাতের মাস। এই পবিত্র মাসকে কেন্দ্র করে মুসলিম সমাজে বহু ফজিলত ও বিশ্বাস প্রচলিত রয়েছে। এর অনেকগুলো কোরআন ও সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত হলেও, কিছু ধারণা কেবল মানুষের মুখে মুখে চালু হয়েছে,যার কোনো নির্ভরযোগ্য শরয়ি ভিত্তি নেই।

তেমনই একটি বহুল প্রচলিত ধারণা হলো, রমজান শুরু হলেই কবরের আজাব বন্ধ হয়ে যায়। এই লেখায় আমরা দলিলের আলোকে এ ধারণার সত্যতা যাচাই করার চেষ্টা করব।

কবরের আজাব সম্পর্কে প্রচলিত ধারণা, অনেক মানুষকে বলতে শোনা যায় –

১.রমজান মাসে কবরের আজাব মাফ থাকে।

২.কোনো ব্যক্তিকে যদি রমজান বা জুমা দিনে দাফন করা হয়, তাহলে কিয়ামত পর্যন্ত তার কবরের আজব হয় না। এ কথাগুলো সমাজে বেশ প্রচলিত হলেও বাস্তবতা হলো, কোরআন মাজিদ ও সহিহ হাদিসে এ ধরনের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায় না। হ্যা কোনো মুসলমান জুমার দিন অথবা জুমার রাত (বৃহস্পতিবার সূর্যাস্তের পর) ইন্তেকাল করে তাহলে, আল্লাহ তাআলা তাকে কবরের ফিতনা (আজাব) থেকে রক্ষা করবেন।

রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

مَا مِنْ مُسْلِمٍ يَمُوتُ يَوْمَ الْجُمُعَةِ أَوْ لَيْلَةَ الْجُمُعَةِ إِلَّا وَقَاهُ اللَّهُ فِتْنَةَ الْقَبْرِ যে কোনো মুসলমান জুমার দিন অথবা জুমার রাত (বৃহস্পতিবার সূর্যাস্তের পর) ইন্তেকাল করে, আল্লাহ তাআলা তাকে কবরের ফিতনা (আজাব) থেকে রক্ষা করেন। (সুনানুত তিরমিজি: ১০৭৪;মুসনাদু আহমাদ:৬৫৮২)

কবরের আজাবের সাথে রমজানের সম্পর্ক আছে কি?

আসলে কবরের আজাব হওয়া বা না-হওয়ার বিষয়টি কোনো মাস বা সময়ের সাথে সম্পৃক্ত নয়। এর সম্পর্ক সরাসরি ব্যক্তির ১.ঈমান ২.আমল ৩.তাকওয়া ও গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার সাথে রমজান মাস নিজেই একটি বরকতময় সময়, এতে ইবাদতের সুযোগ বাড়ে, গুনাহ থেকে বাঁচা সহজ হয়। কিন্তু শুধু রমজান শুরু হলেই কবরের আজাব স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যায়,এমন কোনো প্রমাণ নেই।

রোজাদার অবস্থায় ইন্তেকালের ফজিলত

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলাদা করে উল্লেখযোগ্য রোজাদার অবস্থায় ইন্তেকাল করলে তার বিশেষ ফজিলত রয়েছে।

হুজায়ফা রা. থেকে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

وَمَنْ صَامَ يَوْمًا ابْتِغَاءَ وَجْهِ اللهِ خُتِمَ لَهُ بِهَا دَخَلَ الْجَنَّةَ যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে এক দিন রোজা রাখে, আর সেই রোজাই যদি তার জীবনের শেষ আমল হয় (অর্থাৎ রোজাদার অবস্থায় তার ইন্তেকাল হয়), সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। মুসনাদু আহমাদ: ২৩৩২৪; সুনানু বায়হাকি:৬৫১; মাজমাউজ যাওয়ায়িদ: ১১৯৩৫।

এ থেকে বোঝা যায় রোজাদার অবস্থায় মৃত্যু হওয়া একটি বড় সৌভাগ্যের বিষয়। তবে এটাও বলা যাবে না যে, রমজানে মারা গেলেই কবরের আজাব নিশ্চিতভাবে মাফ হয়ে যায়।

ভুল ধারণার সম্ভাব্য কারণ

এই ভুল ধারণার পেছনে সম্ভবত একটি প্রসিদ্ধ হাদিসের ভুল ব্যাখ্যা করা হয়েছে। রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

إِذَا كَانَتْ أَوَّلُ لَيْلَةٍ مِنْ رَمَضَانَ صُفِّدَتِ الشَّيَاطِينُ، وَمَرَدَةُ الْجِنِّ، وَغُلِّقَتْ أَبْوَابُ النَّارِ فَلَمْ يُفْتَحْ مِنْهَا بَابٌ، وَفُتِحَتْ أَبْوَابُ الْجَنَّةِ فَلَمْ يُغْلَقْ مِنْهَا بَابٌ، وَلِلَّهِ عُتَقَاءُ مِنَ النَّارِ، وَذَلِكَ فِي كُلِّ لَيْلَةٍ. রমজানের প্রথম রাতে শয়তানদের শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়, জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়, জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয় এবং প্রতি রাতে আল্লাহ তাআলা বহু মানুষকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন। (সুনানু ইবনু মাজাহ:১৬৪২; সহিহ ইবনু খুজাইমা:১৮৮৩; মুসতাদরাকু হাকেম:১৫৩২) এ হাদিসের জাহান্নামের দরজাসমূহ বন্ধ করা হয়, এই অংশ থেকে কেউ কেউ ধারণা করেছেন, রমজানে কবরের আজাবও বন্ধ থাকে। অথচ হাদিসে কবরের আজাব সম্পর্কে কোনো বক্তব্য নেই।

সবকিছু মিলিয়ে স্পষ্টভাবে বলা যায়

১.রমজান মাস রহমত ও মাগফিরাতের মাস
২.এ মাসে জাহান্নামের দরজাসমূহ বন্ধ থাকে
৩.রোজা অবস্থায় ইন্তেকাল করলে জান্নাতের সুসংবাদ রয়েছে,

কিন্তু রমজান শুরু হলেই কবরের আজব বন্ধ হয়ে যায়, এমন কোনো কথা কোরআন বা হাদিসে নেই অতএব আমাদের উচিত প্রচলিত কথার অনুসরণ না করে, দলিলভিত্তিক আকিদা গ্রহণ করা এবং ঈমান ও আমল শুদ্ধ করার প্রতি গুরুত্ব দেওয়া। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে কবরের আজাব থেকে হিফাজত করুন। আমিন।

Read Previous

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য শুল্ক সমন্বয়ে ২৫টি বোয়িং কেনার প্রস্তাব বিমানের

Read Next

দেশের বাজারে আবারও স্বর্ণের দামে বড় পতন

Most Popular