শহীদরা মরে না, তারা আল্লাহর কাছে জীবিত

মানুষমাত্রই মরণশীল। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘সকল সত্তাই মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করবে।’ (সুরা-৩ আলে ইমরান, আয়াত: ১৮৫)।

সব ধরনের মৃত্যুর মধ্যে গৌরবের ও মর্যাদার মৃত্যু হলো শহীদের মৃত্যু বা শহীদি মরণ। ‘শহীদ’ আরবি শব্দ, মূল আরবি উচ্চারণে এটি ‘শাহীদ’।

ইসলামি পরিভাষায় ‘জিহাদে’ বা ধর্মীয় যুদ্ধে যারা দীন ইসলামের জন্য জীবন দেন, তাদের শহীদ বলা হয়। শহীদ হলো সবচেয়ে সম্মানীয় ব্যক্তি। শহীদকে শাহাদাতের পর জানাজার আগে গোসল দিতে হয় না; বরং পরনের কাপড়, জুতা, মোজাসহ দাফন করা হয়।

শহীদের সব পাপ ও ভুলত্রুটি আল্লাহ ক্ষমা করে দেন। শহীদ শাহাদাতের চিহ্ন নিয়ে হাশরের ময়দানে উঠবেন এবং অন্যদের জন্য সুপারিশ করবেন। শহীদি মৃত্যু সর্বাধিক সম্মানের। নবী-রাসুলরাও শাহাদাতের জন্য দোয়া করতেন।

যারা নিজের জীবন, সম্পদ ও সম্মান রক্ষার জন্য এবং ন্যায্য অধিকার আদায়, প্রাপ্য অধিকার রক্ষা ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য যুদ্ধ করেন, তারাও গাজি এবং শহীদের মর্যাদা লাভ করেন।

হাদিস শরিফে এসেছে হজরত জায়েদ ইবনে আমর ইবনে নুফাইল (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি তার সম্পদ রক্ষার জন্য জীবন দিল সে শহীদ; যে ব্যক্তি তার জীবন রক্ষার জন্য নিহত হলো সে শহীদ, যে ব্যক্তি তার ধর্ম রক্ষার জন্য জীবন দিল সে শহীদ, যে ব্যক্তি তার পরিবার, আত্মীয়স্বজন রক্ষার জন্য জীবন দিল সে শহীদ।’ (আবু দাউদ ও তিরমিজি, হাদিস: হাসান-সহিহ)।

ইসলামের দৃষ্টিতে শহীদের বিদায় কোনো সাধারণ বিদায় নয়। এটি সেই বিদায়, যা দুনিয়ার সীমা পেরিয়ে আখিরাতের চিরস্থায়ী জীবনের সূচনা করে। কুরআন ও হাদিসে যাদের ‘শহীদ’ বলা হয়েছে, আল্লাহ তাদের মর্যাদা সম্পর্কে আমাদের সুস্পষ্ট ধারণা দিয়েছেন।

কুরআনের একটি আয়াত আমাদের শোকের ভাষাকে বদলে দেয়। আমরা যাকে হারানো বলি, আল্লাহ তাকে বলেন জীবিত। আল্লাহ তাআলা শহীদদের অবস্থান সম্পর্কে বলেন— ‘যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়েছে, তাদের কখনো মৃত মনে করো না বরং তারা জীবিত, তাদের রবের কাছে রিজিক প্রাপ্ত হয়।’ (সুরা আল-ইমরান: আয়াত ১৬৯)

শহীদদের বিশেষ জীবন ও আনন্দ

শহীদের জীবন দুঃখের নয় বরং আনন্দের। তারা দুনিয়ার সীমাবদ্ধতা থেকে মুক্ত হয়ে রবের সান্নিধ্যে পৌঁছে যান। আল্লাহ তাআলা আরও বলেন—‘আল্লাহ তাদের নিজ অনুগ্রহে যা দিয়েছেন, তাতে তারা আনন্দিত।’ (সুরা আল-ইমরান: আয়াত ১৭০)

শহীদের মর্যাদা এমন, যা জান্নাতের নেয়ামত দেখেও তাকে আবার কুরবানির পথে ডাক দেয়।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন— ‘জান্নাতে প্রবেশকারী কেউই দুনিয়ায় ফিরে আসতে চাইবে না— যদিও পৃথিবীর সবকিছু তাকে দেওয়া হয়— শুধু শাহাদাত ছাড়া। শহীদ আবার দুনিয়ায় ফিরে এসে আল্লাহর পথে শহীদ হতে চায়।’ (বুখারি ২৮১৭, মুসলিম ১৮৭৭, মিশকাত ৩৮০৩)

শহীদের প্রথম পুরস্কার এমন ক্ষমা; যা বহু বছরের ইবাদতেও অনেকের নসিব হয় না। নবী (সা.) বলেন- শহীদের জন্য আল্লাহর কাছে ছয়টি পুরস্কার সুরক্ষিত রয়েছে—

১. غْفَرُ لَهُ فِي أوَّلِ دفعةٍ وَيَرَى مَقْعَدَهُ مِنَ الْجَنَّةِ — যুদ্ধরত অবস্থায় তার রক্তের ফোঁটা মাটিতে ঝরা মাত্রই তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হয় এবং তাকে জান্নাতের আবাসস্থল দেখানো হয়।

২. وَيُجَارُ مِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ — তাকে কবরের আজাব থেকে নিষ্কৃতি দেওয়া হয়।

৩. وَيَأْمَنُ مِنَ الْفَزَعِ الْأَكْبَرِ — হাশরের ময়দানের মহাভীতি থেকে দূরে রাখা হয়।

৪. وَيُوضَعُ عَلَى رَأْسِهِ تَاجُ الْوَقَارِ الْيَاقُوتَةُ مِنْهَا خَيْرٌ مِنَ الدُّنْيَا — (কেয়ামতের দিন) সম্মানজনকভাবে তার মাথায় ইয়াকুতের মুকুট পরানো হবে, যার মধ্যে খচিত একটি ইয়াকুত দুনিয়া ও তার সমস্ত ধন-সম্পদ থেকে উত্তম।

৫. وَمَا فِيهَا ويزوَّجُ ثنتينِ وَسَبْعِينَ زَوْجَةً مِنَ الْحُورِ الْعِينِ — সুন্দর বড় বড় চক্ষুবিশিষ্ট বাহাত্তর জন হুরকে তার সঙ্গিনীরূপে দেওয়া হবে।

৬. وَيُشَفَّعُ فِي سَبْعِينَ مِنْ أَقْرِبَائِهِ — তার নিকটাত্মীয়দের মধ্যে সত্তরজনের সুপারিশ কবুল করা হবে। (তিরমিজি ১৬৬৩, ইবনু মাজাহ ২৭৯৯, মিশকাত ৩৮৩৪)

শহীদের মৃত্যুতে আমাদের চোখ ভিজে আসে ঠিকই কিন্তু একজন মুমিন হিসেবে আমাদের হৃদয় আশাবাদী। আমরা জানি— ‘নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহরই এবং তার কাছেই আমরা ফিরে যাব।’ (সুরা বাকারা: আয়াত ১৫৬)

সুতরাং আমাদের দায়িত্ব হলো-

শহীদদের জন্য দোয়া করা

তাদের আদর্শ ও সাহস থেকে শিক্ষা নেওয়া

ইনসাফ, সত্য ও ন্যায়ের পথে অবিচল থাকা

Read Previous

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ : প্রবাসীদের খোঁজখবর নিলেন প্রধানমন্ত্রী

Read Next

সীতাকুন্ডে শিশুকে গলা কেটে হত্যাচেষ্টা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular