ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এখনও চালু হয়নি শিশুদের আইসিইউ ইউনিট। এতে দীর্ঘ হচ্ছে মৃত্যুর তালিকা। হাসপাতালটির হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে গত এক মাসে মৃত্যু হয়েছে ১৪ শিশুর। গুরুতর অবস্থায় আইসিইউ প্রয়োজন হলে বিকল্প হিসেবে বাবল সিপ্যাপ পদ্ধতি ব্যবহারের কথা জানান চিকিৎসকরা। তবে, বরাদ্দ পেলেই শিশুদের আইসিইউ চালুর আশ্বাস কর্তৃপক্ষের।
আট মাসের শিশুকে নিয়ে গত সপ্তাহে ফুলবাড়িয়া থেকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছুটে আসেন মা ফেরদৌসী। হামের উপসর্গ থাকায় ভর্তি করা হয় আইসোলেশন ওয়ার্ডে। শারীরিক অবস্থা গুরুতর হওয়ায় শিশুটির প্রয়োজন হয় আইসিইউ সাপোর্টের। কিন্তু হাসপাতালে শিশুদের জন্য নেই আইসিইউ।
এমন অবস্থায় অনেক শিশুর আইসিইউ প্রয়োজন হলেও মিলছে না সুবিধা। এতে কারও মৃত্যু হচ্ছে, অনেকের বাড়ছে মৃত্যু ঝুঁকি। সংকটাপন্ন অবস্থায় কাউকে আবার ঢাকায় রেফার্ড করা হচ্ছে। এতে আতঙ্ক আর ভোগান্তি বেড়েই চলছে রোগী ও অভিভাবকদের।
হাম আইসোলেশন ওয়ার্ড ঘুরে দেখা গেছে, সন্তান নিয়ে বাবা-মায়েদের ব্যাকুলতা।
রোগীর মা ফেরদৌসী আক্তার বলেন, ‘বাচ্চা যদি আইসিইউয়ে থাকত, তাহলে দ্রুত ভালো হতো। এইরকম অবস্থা অনেকেরই। কিন্তু আইসিইউ নেই, ডাক্তাররা এখন বোতল দিয়ে একটি যন্ত্র তৈরি করে দিচ্ছেন।’
হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে, প্লাস্টিকের একটি পানির বোতলের সাহায্যে বিশেষ পদ্ধতিতে যন্ত্রটি তৈরি করা হয়েছে। যন্ত্রটি শিশুটির শয্যার নিচে রাখা হয়। বোতলে পানি ও সেটিতে একটি নল লাগানো। যার মাধ্যমে হাসপাতালের কেন্দ্রীয় অক্সিজেন সরবরাহের সঙ্গে সংযোগ ঘটিয়ে শিশুটির নাক দিয়ে অক্সিজেন দেয়া হচ্ছে।
শিশুদের আইসিইউ না থাকায় হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন শিশুদের যখন অতিরিক্ত শ্বাসকষ্ট শুরু হয় এবং আইসিইউয়ে নিয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা সৃষ্টি হয়, তখন বিকল্প হিসেবে বাবল সিপ্যাপ ব্যবহার করার কথা জানান ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের সহকারী রেজিস্ট্রার ও হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডের দায়িত্বে থাকা চিকিৎসক মাজহারুল আমিন।
তিনি বলেন, ‘বাবল সিপ্যাপ তৈরিতে সরকার প্রশিক্ষণ দিয়েছে এবং বাবল সিপ্যাপ সরবরাহ করেছে। নির্দেশনা অনুযায়ী যে বাচ্চাদের অতিরিক্ত শ্বাসকষ্ট হচ্ছে, স্বাভাবিক অক্সিজেনে যাদের অক্সিজেন স্যাচুরেশনের মাত্রা কমে যায়, সেই বাচ্চাদের সাধারণত বাবল সিপ্যাপ দিয়ে থাকেন।’
চিকিৎসক মাজহারুল আমিন বলেন, ‘আমরা দেখতে পাচ্ছি, বাবল সিপ্যাপ দেয়ার পর বাচ্চার রেসপন্স (সাড়া) খুব ভালো। বেশ কয়েকটি বাচ্চা অনেকটা সুস্থের পথে। আমাদের যা পর্যবেক্ষণ, তা হলো ভর্তি থাকা শিশুদের মধ্যে সাত থেকে আট জন বাচ্চা আইসিইউয়ে যাওয়ার মতো অবস্থায় রয়েছে। তাদের বাবল সিপ্যাপ দেয়ায় অনেকটা শ্বাসকষ্ট কমে আসছে। দুই-একটা বাচ্চা ক্রিটিক্যাল থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভালোর দিকে।’
ময়মনসিংহ মেডিকেলের হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে উপসর্গ নিয়ে রোগীর সংখ্যা বাড়ছেই। কর্তৃপক্ষ বলছে, হাসপাতালটিতে শিশুদের জন্য আইসিইউ ওয়ার্ড প্রস্তুত থাকলেও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও জনবলের কারণে সেটি চালু করা হয়নি। তবে, প্রয়োজনীয় জনবল ও যন্ত্রপাতির পাশাপাশি বরাদ্দ পেলে শিগগিরই শিশুদের আইসিইউ সেবা চালু করা যাবে, বলছে কর্তৃপক্ষ।
হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) মাইনউদ্দিন খান বলেন, ‘লজিস্টিক ও লোকবলের চাহিদা মন্ত্রণালয়ে দেয়া আছে। যদি সেই বরাদ্দ পাই তাহলে দ্রুতই শিশুদের আইসিইউ চালু করতে পারবো। তখন শিশুদের আইসিইউ সাপোর্ট পুরোদমে দিতে পারবো।’
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে গত ২৪ ঘণ্টায় আরও এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এতে গত এক মাসে ১৪ শিশুর মৃত্যু হল। আর গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন রোগী ভর্তি হয়েছে ৩৪ জন, ছুটি দেয়া হয়েছে ৭২ জনকে। বর্তমানে চিকিৎসাধীন ৭৮ রোগী। গত ১৭ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হাসপাতালটিতে হাম আক্রান্ত ও উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছে ৬১১ জন। যার মধ্যে ছুটি দেয়া হচ্ছে ৫১৯ জনকে।
