ডিজিটাল যুগে গিবত: একজন মুসলমানের করণীয়

একসময় গিবত, অপবাদ কিংবা মিথ্যা প্রচারের পরিধি ছিল একটি পরিবার, মহল্লা বা গ্রামের মধ্যে সীমাবদ্ধ। কিন্তু প্রযুক্তির অভূতপূর্ব অগ্রগতিতে সেই বাস্তবতা আমূল বদলে গেছে। এখন একটি পোস্ট, একটি মন্তব্য কিংবা একটি শেয়ার, কয়েক সেকেন্ডেই লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়।

ফলে একজন মানুষের সম্মানহানি, গুজব কিংবা চরিত্রহননও আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। তাই ডিজিটাল যুগে একজন মুসলিমের ঈমান ও নৈতিকতার অন্যতম বড় পরীক্ষা হলো, সে কী লিখছে, কী শেয়ার করছে এবং কী প্রচার করছে।

ইসলাম মানুষের সম্মান, মর্যাদা ও সত্যবাদিতাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। তাই পবিত্র কোরআনে যেমন মিথ্যা ও অপবাদ থেকে কঠোরভাবে সতর্ক করা হয়েছে, তেমনি রাসুলুল্লাহ (সা.) জিহ্বার হেফাজতকে নাজাতের অন্যতম উপায় হিসেবে বর্ণনা করেছেন। আজকের বাস্তবতায় এই শিক্ষা কেবল মুখের কথার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং স্মার্টফোনের কিবোর্ড, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট, মন্তব্য ও বার্তার ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য।

আল্লাহ তাআলা বলেন, মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে, তা লিপিবদ্ধ করার জন্য তৎপর প্রহরী তার সঙ্গেই রয়েছে। (সুরা কাফ : ১৮)

মুফাসসিরগণ বলেন, মানুষের প্রতিটি কথা ও কাজ আল্লাহর নির্দেশে ফেরেশতারা সংরক্ষণ করেন। আজকের বাস্তবতায় এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আমাদের প্রতিটি লেখা, মন্তব্য, বার্তা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিটি শব্দ। আমরা হয়তো একটি বাক্য লিখে মুহূর্তেই ভুলে যাই, কিন্তু তা আল্লাহর কাছে সংরক্ষিত থেকে যায়।

ডিজিটাল যুগের অন্যতম বড় সংকট হলো ভুয়া খবর ও গুজব। কোনো ঘটনার সত্যতা যাচাই না করেই তা শেয়ার করা এখন অনেকের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। কখনো আবেগে, কখনো রাজনৈতিক পক্ষপাতের কারণে, আবার কখনো ধর্মীয় অনুভূতিকে ব্যবহার করে অসত্য তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া হয়। অথচ আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন,

হে মুমিনগণ! কোনো ফাসিক ব্যক্তি যদি তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তা যাচাই করে নাও। অন্যথায় অজ্ঞতাবশত তোমরা কোনো সম্প্রদায়ের ক্ষতি করে ফেলবে এবং পরে নিজেদের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হবে।
(সুরা হুজুরাত : ৬)

তাফসিরবিদরা উল্লেখ করেছেন, আয়াতটি একটি বিশেষ ঘটনাকে কেন্দ্র করে নাজিল হলেও এর শিক্ষা সর্বজনীন। তথ্য যাচাই ছাড়া কোনো সংবাদ গ্রহণ বা প্রচার করা একজন মুমিনের জন্য শোভন নয়। আধুনিক সাংবাদিকতায় যেমন ফ্যাক্ট-চেক অপরিহার্য, ইসলামও চৌদ্দশ বছর আগে সংবাদ যাচাইয়ের এই নীতি শিক্ষা দিয়েছে।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কোনো ব্যক্তির মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে যা শোনে তাই (যাচাই ছাড়া) বর্ণনা করতে থাকে।
(সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৫)

আজকের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে এই হাদিসের তাৎপর্য আরও গভীর। অনেকেই মনে করেন, আমি তো শুধু শেয়ার করেছি। অথচ যাচাই ছাড়া মিথ্যা প্রচারে অংশ নেওয়াও গুনাহের অংশীদার হওয়া।

ডিজিটাল মাধ্যমে গিবত ও অপবাদ নতুন রূপ ধারণ করেছে। কাউকে নিয়ে বিদ্রূপাত্মক মন্তব্য করা, চরিত্রহননের উদ্দেশ্যে পোস্ট লেখা, ব্যক্তিগত ছবি বা কথোপকথন ছড়িয়ে দেওয়া, ট্রল এর মাধ্যমে কাউকে অপমান করা, এসবই অনেক ক্ষেত্রে গিবত, অপবাদ কিংবা মানুষের সম্মানহানির অন্তর্ভুক্ত।

আল্লাহ তাআলা বলেন, তোমাদের কেউ যেন কারও গিবত না করে। তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত ভক্ষণ করতে পছন্দ করবে? নিশ্চয়ই তোমরা তা ঘৃণা করবে। (সুরা হুজুরাত : ১২)

রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা কি জানো, গিবত কী? সাহাবিরা বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসুলই অধিক জানেন। তিনি বললেন, তোমার ভাই সম্পর্কে এমন কথা বলা, যা সে অপছন্দ করে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৫৮৯)

ইমাম নববী (রহ.) ব্যাখ্যা করেছেন, গিবত শুধু মুখে নয়, বরং লেখা, ইঙ্গিত, অঙ্গভঙ্গি বা যেকোনো মাধ্যমে কারও এমন দোষ প্রকাশ করা, যা সে অপছন্দ করে, সবই গিবতের অন্তর্ভুক্ত। আজকের ডিজিটাল বাস্তবতায় এই ব্যাখ্যার গুরুত্ব আরও বেড়েছে।

রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের ওপর ঈমান রাখে, সে যেন উত্তম কথা বলে, অন্যথায় নীরব থাকে। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬০১৮)

আরেক হাদিসে তিনি সতর্ক করে বলেছেন, বান্দা কখনো এমন একটি কথা বলে, যার পরিণতি সে গুরুত্ব দিয়ে চিন্তা করে না, অথচ সেই একটি কথার কারণে সে জাহান্নামে এমন গভীরে পতিত হয়, যা পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যবর্তী দূরত্বের চেয়েও বেশি। (সহিহ বুখারি; সহিহ মুসলিম)

একইভাবে ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) তাঁর আদ-দা’ ওয়াদ-দাওয়া গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, জিহ্বার গুনাহ মানুষের অন্তরের রোগের অন্যতম প্রকাশ। আজ সেই জিহ্বার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে স্মার্টফোনের কিবোর্ড, টাচস্ক্রিন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম।

প্রযুক্তি কখনো শত্রু নয়, বরং এটি আল্লাহর দেওয়া একটি আমানত। এই আমানতের মাধ্যমে যেমন কোরআনের বাণী, ইসলামের সৌন্দর্য ও মানবকল্যাণের বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া যায়, তেমনি অসতর্ক ব্যবহারে গুনাহও মুহূর্তের মধ্যে লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে।

তাই কোনো কিছু পোস্ট, মন্তব্য বা শেয়ার করার আগে একজন মুমিনের নিজের কাছে কয়েকটি প্রশ্ন রাখা উচিত, এটি কি সত্য? এটি কি কারও সম্মান ক্ষুণ্ন করবে? এটি কি সমাজে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করবে? আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে আমি কি এর জবাব দিতে পারব?

আজ স্মার্টফোন আমাদের হাতে, কিন্তু তার ব্যবহার আমাদের ঈমানেরও পরীক্ষা। একটি ক্লিক যেমন সদকায়ে জারিয়ার মাধ্যম হতে পারে, তেমনি একটি মিথ্যা পোস্ট, একটি অপবাদ কিংবা একটি গিবতও হতে পারে দীর্ঘস্থায়ী গুনাহের কারণ।

তাই প্রতিটি পোস্ট, মন্তব্য ও শেয়ারের আগে একজন মুমিনের নিজেকে প্রশ্ন করা উচিত, এটি কি সত্য? এটি কি কল্যাণকর? এটি কি আল্লাহকে সন্তুষ্ট করবে? যদি উত্তর ‘না’ হয়, তবে নীরব থাকাই উত্তম। কারণ, ডিজিটাল যুগেও একজন মুসলিমের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার তাকওয়া, সত্যবাদিতা এবং মানুষের সম্মান রক্ষার মানসিকতা।

Read Previous

হাম উপসর্গে আরও ২ শিশুর মৃত্যু

Read Next

যে পাঁচ কারণে ফ্রান্সকে হারাতে পারে মরক্কো

Most Popular