বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক অঞ্চল নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, চট্টগ্রামের আনোয়ারায় কর্ণফুলী নদীর পূর্ব তীরে ‘চায়না অর্থনৈতিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন’ (সিইআইজেড)-এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মাধ্যমে বাংলাদেশের শিল্প খাতে এক নতুন ও ঐতিহাসিক যুগের সূচনা হয়েছে।

সোমবার (২৭ জুলাই) চট্টগ্রামের আনোয়ারায় সিইআইজেড-এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি।

বাংলাদেশ ও গণচীন সরকারের (জি-টু-জি) যৌথ উদ্যোগে এবং ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’-এর নীতিমালার আলোকে গৃহীত এই প্রকল্পটি দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, বৈচিত্র্যময় শিল্পায়ন এবং বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখবে।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বিশেষ অতিথি হিসেবে আরও বক্তব্য রাখেন ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন। সভাপতির বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) ও বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা)-এর নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও সহজীকরণে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এরই অংশ হিসেবে চীন-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চলে সরকারের নীতিগত সহায়তার মাধ্যমে অবকাঠামো ও শিল্প স্থাপনে প্রায় ১ বিলিয়ন (১০০ কোটি) মার্কিন ডলারের বিশাল বিনিয়োগ অর্জিত হতে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, বিনিয়োগকারীদের দ্রুত ও সহজ সেবা প্রদান নিশ্চিতে সরকার খুব শিগগিরই শতভাগ কার্যকর ‘সিঙ্গেল উইন্ডো সার্ভিস’ চালুর পাশাপাশি পুঁজিবাজার ও মূলধনী খাতে কৌশলগত বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।

তিনি আরও বলেন, শিল্পায়নের পাশাপাশি শ্রমিকদের আবাসন, আধুনিক জীবনযাত্রার মান এবং পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ করা বর্তমান সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার। তিনি আনোয়ারা শিল্পাঞ্চলে দেশীয় শিল্পের বিকাশ, সাপ্লাই চেইন জোরদারকরণ এবং দক্ষ জনবল তৈরির লক্ষ্যে একটি আধুনিক ‘স্কিল ডেভেলপমেন্ট সেন্টার’ স্থাপনে চায়নিজ অংশীদারদের প্রতি আহ্বান জানান।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আজকে আনোয়ারার এই ঊর্বর মাটিতে সিইআইজেড-এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মধ্য দিয়ে আমরা কেবল এক কোদাল মাটিই তুলছি না, বরং বাংলাদেশের শিল্প রূপান্তরের এক নতুন অধ্যায়ের শুভ সূচনা করছি।

তিনি উল্লেখ করেন, দুই দেশের পারস্পরিক বিশ্বাস, গভীর বন্ধুত্বের সুদৃঢ় ভিত্তি এবং যৌথ সনদের আলোকে গৃহীত এই জি-টু-জি প্রকল্পটির মাধ্যমে দু’দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতা এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছালো।

প্রকল্পটির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও জানান, প্রায় ৭৭৬ একর (৩১৪.৩৯ হেক্টর) এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এই বৃহৎ প্রকল্পের মাধ্যমে কেবল চট্টগ্রাম অঞ্চলেই ৩৬ হাজারেরও বেশি মানুষের প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান তৈরি হবে, যা স্থানীয় যুবসমাজের ভাগ্যোন্নয়নে এক অভূতপূর্ব প্রভাব ফেলবে।

তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল শিল্পের পাশাপাশি এই অঞ্চলে বায়ো-ফার্মাসিউটিক্যালস, ফুড অ্যান্ড বেভারেজ প্রসেসিং এবং চামড়াজাত পণ্যের মতো উচ্চ-মূল্যের শিল্প প্রতিষ্ঠিত হবে, যা বাংলাদেশের রফতানি খাতকে আরও বৈচিত্র্যময় ও শক্তিশালী করবে।

ভৌগোলিক ও লজিস্টিক দিক থেকে সিইআইজেড অত্যন্ত সুবিধাজনক স্থানে অবস্থিত উল্লেখ করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, এটি কর্ণফুলী টানেল থেকে মাত্র ৭০০ মিটার, শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ৬ কিলোমিটার এবং চট্টগ্রাম বন্দর থেকে মাত্র ১২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এন-১ জাতীয় মহাসড়কের সাথে সরাসরি যুক্ত হওয়ায় এর পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা হবে অত্যন্ত সহজ ও দ্রুত।

তিনি বলেন, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় এখানে আন্তর্জাতিক মানের সেন্ট্রাল এফলুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (সিইটিপি) ও পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো নির্মাণ করা হচ্ছে, যা টেকসই শিল্পায়নের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।

বিনিয়োগকারীদের সার্বিক নিরাপত্তার আশ্বাস দিয়ে মন্ত্রী স্পষ্ট করেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সিইআইজেড-এর সার্বিক নিরাপত্তা, নিরবচ্ছিন্ন পরিবহন করিডোর এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সর্বদা প্রস্তুত থাকবে। একই সাথে বেজা-এর ‘ওয়ান-স্টপ সার্ভিস (OSS)’-এর মাধ্যমে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এড়িয়ে দ্রুত অনুমোদন ও গ্যাস-বিদ্যুতের মতো পরিষেবা নিশ্চিত করে একটি সহজ ও সমৃদ্ধ বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির দৃঢ় প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন তিনি।

বক্তব্যের শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এই বৃহৎ কর্মযজ্ঞ সফলভাবে বাস্তবায়নের জন্য বেজা, চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশন (সিআরবিসি), ঢাকাস্থ চীনা দূতাবাস এবং বিশেষ করে আনোয়ার ও চট্টগ্রামের সর্বস্তরের জনগণকে ধন্যবাদ জানান। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এই শিল্প অঞ্চলটি বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যকার স্থায়ী অর্থনৈতিক ও বন্ধুত্বের এক টেকসই সেতু হিসেবে কাজ করবে।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত Yao Wen (ইয়াও ওয়েন), চট্টগ্রাম-১৩ (আনোয়ারা-কর্ণফুলী) আসনের সংসদ সদস্য সারোয়ার জামাল নিজাম এবং চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশন (সিআরবিসি)-এর ভাইস চেয়ারম্যান Li Changgui। স্বাগত বক্তব্য রাখেন Bangladesh CEIZ Company Ltd (BCCL) এর চেয়ারম্যান Wang Benqian. এছাড়া অনুষ্ঠানে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি এবং প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

 

Read Previous

সাবেক রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে আমলে নেওয়ার মতো অভিযোগ নেই

Read Next

দেশে যাত্রা শুরু করল বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী বাতির প্রতিষ্ঠান ‘হেইগা’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular