নির্যাতন-নির্বাসন: অতঃপর তারেক রহমানের নতুন অধ্যায়

 

প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কারাবন্দি দিবস আজ। রাজনৈতিক নানা অস্থিরতায় ২০০৭ সালের এই দিনে ক্যান্টনমেন্টের মঈনুল রোডের বাসা থেকে তাকে গ্রেফতার করেছিল সেনাসমর্থিত এক-এগারো সরকার। দেড় বছর কারাবন্দি থাকা অবস্থায় নির্মম নির্যাতনের শিকার হন তারেক রহমান।

তবে যাকে ঘিরে এত আলোচনা, জিয়া পরিবারের সন্তান সেই তারেক রহমানের পেছনের ১৭ বছরের গল্পটা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। দীর্ঘ নির্বাসিত জীবনের অবসানে তার দল, সমর্থক ও অনুসারীরা স্বস্তি পেলেও বিভীষিকাময় দিনগুলো পাড়ি দিতে হয়েছে পুরো জিয়া পরিবারকেই।

২০০৭ সাল, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অরাজকতার মধ্য দিয়ে ১১ জানুয়ারি ক্ষমতায় আসে সেনাসমর্থিত মঈনুদ্দিন-ফখরুদ্দিনের সরকার। সে বছরের ৭ মার্চ ভোরে আলোচিত এক-এগারো সরকার বিনা ওয়ারেন্টে ঢাকার মঈনুল রোডের বাসভবন থেকে আটক করে তারেক রহমানকে। দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দিতে তার বিরুদ্ধে দেয়া হয় একে একে ১৩টি মামলা। ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে, তাকে নেয়া হয় ডিটেনশনে। ছয় দফায় ১৩ দিনের রিমান্ডে নিয়ে করা হয় অমানবিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। দেশ ও রাজনীতি ছাড়ার চাপ দেয়া হয় তাকে।

২০০৭ সালের ২৮ নভেম্বর আদালতের কাঠগড়ায় তারেক রহমান নিজেই তার ওপর নির্যাতনের বর্ণনা দেন। বারবার রিমান্ডের নামে নির্যাতনের একপর্যায়ে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে ২০০৮ সালের ৩১ জানুয়ারি তৎকালীন পিজি হাসপাতালের প্রিজন সেলে ভর্তি করা হয় তাকে।

চিকিৎসকদের দেয়া মেডিকেল রিপোর্টে বলা হয়, নির্যাতনে তারেক রহমানের মেরুদণ্ডের দুটি হাড় ভেঙে গেছে। বেঁকে গেছে কয়েকটি হাড়। কমেছে মেরুদণ্ডের ৩৩টি হাড়ের দূরত্ব। চোখ ও হৃদযন্ত্রের নানা সমস্যার কথাও উল্লেখ করা হয় সে রিপোর্টে।

স্বাস্থ্যের অবনতি হতে থাকলে রাজপথে আন্দোলনের চাপে এক এগারোর সরকার মুক্তি দিতে বাধ্য হয় তারেক রহমানকে। ২০০৮ সালের ৩ সেপ্টেম্বর জামিন পান তিনি। ১১ সেপ্টেম্বর রাতে উন্নত চিকিৎসার জন্য অসুস্থ তারেক রহমানকে নেয়া হয় যুক্তরাজ্যে। নির্বাসিত জীবনের শুরু থেকে শেষ অবধি যুক্তরাজ্যেই থাকতে হয় তাকে।

এক এগারোর সেনাসমর্থিত সরকার চলে গেলেও পরবর্তী সাড়ে ১৫ বছর আওয়ামী লীগ শাসনামলে আর দেশে ফেরা হয়নি তারেক রহমানের। এমনকি আশির অধিক মামলা দেয়া হয় তার বিরুদ্ধে, আদলতকে ব্যবহার করে তার বক্তব্য প্রচারের নিষেধাজ্ঞা জারি করে শেখ হাসিনার সরকার। এর মাঝেই হারাতে হয় ছোটভাই আরাফত রহমান কোকোকে। ষড়যন্ত্রমূলক মামলায় ২০১৮ সালে বন্দি করা হয় মা বেগম খালেদা জিয়াকে। বন্দি অবস্থায় নানা রোগে আক্রান্ত হন বেগম জিয়া। তাকে বঞ্চিত করা হয় উন্নত চিকিৎসা থেকে।

২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেলে, নতুন করে দেশ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে ২০২৫ এর শেষে দেশে প্রত্যাবর্তন করেন জিয়া পরিবার ও বিএনপির কান্ডারি তারেক রহমান। দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রে যাকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেয়ার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছিল, সেই তারেক রহমান জীবনযুদ্ধে সংগ্রাম করে নির্বাসিত জীবন থেকে উঠে আসেন ক্ষমতার শীর্ষবিন্দুতে।

গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপিসহ ৫১টি রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করে। নির্বাচনে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। নির্বাচনে তারেক রহমান দুটি সংসদীয় আসনেই জয়লাভ করেন। তবে তিনি বগুড়ার আসনটি ছেড়ে দিয়ে জাতীয় সংসদে ঢাকা-১৭ আসনের প্রতিনিধিত্ব করছেন।

ঘটনাবহুল রাজনৈতিক জীবনে নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে তারেক রহমান গত ১৭ ফেব্রুয়ারি দেশের ১১তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বঙ্গভবনের চার দেয়াল পেরিয়ে, জাতীয় সংসদের সাউথ প্লাজায় জনগণের সামনে উন্মুক্ত মঞ্চে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার শপথ নেন।

Read Previous

ইফতারে আনারসের উপকারিতা জানেন?

Read Next

বিশ্ববাজারে বেড়েছে অপরিশোধিত তেলের দাম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular