বিশ্বের দেশে দেশে যেভাবে পালিত হলো মহান মে দিবস

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পালিত হয়েছে মহান মে দিবস। বেতন বৈষম্যরোধ, ন্যূনতম মজুরি বাড়ানোসহ কর্মক্ষেত্রে নানা সুযোগ-সুবিধার দাবি নিয়ে রাস্তায় নেমে আসেন শ্রমজীবী মানুষ। পর্তুগালে প্রস্তাবিত শ্রম আইন বাতিলের জোরাল দাবি জানান শ্রমিক নেতারা।

বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে বিশ্বের শ্রমজীবী মানুষের মর্যাদার বিশেষ দিন পালিত হয় পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে। দেশটির শ্রমজীবী মানুষের সংগঠন সিজিটিপির উদ্যোগের আয়োজিত র‍্যালিতে অংশ নিতে রাস্তায় নেমে আসেন লাখো জনতা। ব্যানার ও প্ল্যাকার্ডে তুলে ধরা হয় দাবি-দাওয়া। স্লোগানে স্লোগানে মুখর হয়ে উঠে শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক এভিনিদা আলমিরানতে রেইস।

সপ্তাহে ৩৫ কর্মঘণ্টা নির্ধারণ, ন্যূনতম মজুরি বাড়ানোসহ সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা বা পেনশন নিশ্চিতের দাবি জানান র‍্যালিতে অংশগ্রহণকারীরা। এছাড়া প্রস্তাবিত শ্রম আইন বা লেবার প্যাকেজকে অন্যায্য আখ্যা দিয়ে বাতিলের জোরাল দাবি জানান তারা। বেতন বৈষম্যরোধসহ সবার সমান অধিকারের দাবি নিয়ে অভিবাসীদের সংগঠন সলিডারিটি ইমিগ্র্যান্টের ব্যানারে র‌্যালিতে অংশ নেন প্রবাসী বাংলাদেশিরাও।

নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে ফ্রান্সেও পালিত হয়েছে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস। রাজধানী প্যারিস থেকে শুরু করে অন্যান্য শহর প্রকম্পিত ছিল শ্রমিকদের নানা অধিকারের দাবিতে। তিন লাখের বেশি মানুষ অংশ নেন এবারের সমাবেশে। ফ্রান্সে বসবাসরত কয়েক লাখ অনিয়মিত অভিবাসীদের নিয়মিতকরণের দাবি ছিল এবারের সমাবেশের প্রধান দিক।

মুক্তি ও শান্তি প্রতিষ্ঠার আহ্বানে জার্মানিজুড়ে পালিত হয়েছে মহান মে দিবস। দিবসটি উদযাপনে সবচেয়ে বেশি মানুষের সমাবেশ হয় জার্মানির রাজধানী বার্লিনে। নগরীর নয়াকোলন ও ক্রয়েজবার্গের বিভিন্ন পয়েন্টে শ্রম দিবসের পোস্টার, ব্যানার, প্ল্যাকার্ড নিয়ে হাজির হন লাখো মানুষ। যুদ্ধ, পুঁজিবাদী ব্যবস্থা, শোষণ, বঞ্চনা, জ্বালানি তেল নিয়ে অপরাজনীতির বিরুদ্ধে স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে সমাবেশস্থল।

বার্লিনে মে দিবসের র‌্যালিতে অংশ নেয়া দেশটির এক নাগরিক বলছিলেন, ‘শ্রমিক হিসেবে মে দিবসটি পালন করাটা আমাদের জন্য ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই দেশে কর্মীদের অধিকার ক্রমশ ছোট হয়ে আসছে। যেটি আমাদের জন্য হুমকি। একইসঙ্গে বলতে চাই ইরান, ফিলিস্তিন, ইউক্রেন কিংবা লেবাননে যেন শান্তি প্রতিষ্ঠা হয়।’

মহান মে দিবস উপলক্ষ্যে শুক্রবার ইতালিতে অনুষ্ঠিত হয় বিশাল কনসার্ট। প্রতিবছর মে দিবস উপলক্ষে কনসার্ট আয়োজন করে দেশটির শ্রমিক ফেডারেশনগুলো। এদিন শ্রমিক অধিকার আদায়ে ঐক্যবদ্ধ থাকার অঙ্গীকার করেন নেতারা।

আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস উপলক্ষে মালদ্বীপের রাজধানীতে বর্ণাঢ্য র‍্যালি ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। যেখানে স্থানীয় এবং প্রবাসী শ্রমজীবী মানুষ ব্যানার ও প্ল্যাকার্ড হাতে তাদের অধিকারের কথা জানান। এই সমাবেশের আয়োজন করেন মালদ্বীপ ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেস ও সাধারণ শ্রমজীবী মানুষেরা।

এছাড়া এশিয়া, লাতিন আমেরিকা এবং ইউরোপের অনেক বড় শহরে বিক্ষোভকারীরা জড়ো হন। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরেও প্রতিবাদ হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রে মে ডে পালন করা হয় না; দেশটিতে সরকারি ছুটি লেবার ডে সাধারণত উদযাপন করা হয় যা সেপ্টেম্বর মাসে হয়।

এ বছরের শ্রমিক দিবস এমন এক সময়ে এসেছে, যখন ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বেড়ে গেছে এবং বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা মানুষ ও শ্রমজীবী শ্রেণির ক্রয়ক্ষমতা কমে যাচ্ছে।

তুরস্কে পাঁচ শতাধিক বিক্ষোভকারী আটক

ইস্তাম্বুলের বিখ্যাত তাকসিম স্কয়ারের দিকে মিছিল করার চেষ্টা করলে পুলিশ বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায় এবং ৫০০ জনের বেশি মানুষকে আটক করা হয়। মে ডে উপলক্ষে এই স্কয়ারটি তুরস্কের শ্রমিক আন্দোলনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে গেজি পার্ক বিক্ষোভের জন্য পরিচিত। তবে ২০১২ সাল থেকে এখানে শ্রমিক দিবসের সমাবেশ কার্যত নিষিদ্ধ রয়েছে।

খবরে বলা হয়েছে, দাঙ্গা পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে টিয়ার গ্যাস ও পানি নিক্ষেপকারী যান (ওয়াটার ক্যানন) ব্যবহার করেছে। মেসিডিয়েকয় এবং বেসিকতাস এলাকায়, যেখান থেকে তাকসিমের দিকে যাওয়া যায়, সেসব সড়কও বন্ধ করে দেয়া হয়।

স্থানীয় সংগঠন, যেমন প্রোগ্রেসিভ লয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, আটক করার সময় অনেক বিক্ষোভকারী আহত হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন। পাশাপাশি শ্রমিক দিবসের সমাবেশের আগে শহরের কিছু মেট্রো স্টেশন ও প্রধান সড়ক বন্ধ করে দেয়া হয়। কর্তৃপক্ষ ইস্তাম্বুলের এশীয় অংশে নির্দিষ্ট দুটি স্থানে সমাবেশের অনুমতি দেয়।

আর্জেন্টিনায় শ্রম আইন সংস্কারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ

আর্জেন্টিনায় মে ডে উপলক্ষে শ্রমিকরা বৃহস্পতিবার ভোর থেকেই রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করেন। তারা প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই-এর সাম্প্রতিক শ্রম আইন সংস্কারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

দেশটির সবচেয়ে বড় শ্রমিক সংগঠন জেনারেল কনফেডারেশন অব লেবার (সিজিটি) রাজধানী বুয়েনস এইরেস-এর কেন্দ্রস্থলে সরকার প্রধান কার্যালয়ের দিকে মিছিল করে। তাদের দাবি ছিল, মিলেই সরকারের শ্রম আইনের পরিবর্তনের বিরুদ্ধে ‘সম্মানজনক কর্মসংস্থান রক্ষা’ করা।

এই নতুন পরিবর্তনের ফলে ১৯৭৪ সাল থেকে চালু থাকা শ্রমিকদের বিভিন্ন সুরক্ষা ও অধিকার কমে যেতে পারে। যদিও আগে এসব আইনের কারণে ব্যবসায়িক খরচ বেড়ে যেত এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীরা কিছুটা নিরুৎসাহিত হতো-এমন যুক্তিও রয়েছে।

বিক্ষোভে অংশ নেওয়া শ্রমিকরা ঢাক-ঢোল বাজিয়ে, ব্যানার নিয়ে ও স্লোগান দিয়ে তাদের অসন্তোষ প্রকাশ করেন। সিজিটি নেতা অকটাভিও আরগুয়েলো বলেন, ‘আমরা এই সরকারকে বলতে চাই, যথেষ্ট হয়েছে। আমাদের ধৈর্যের সীমা শেষ, মি. প্রেসিডেন্ট।’

Read Previous

ভারত থেকে গরু আমদানির অনুমতিপত্রের বিষয়ে যা জানাল প্রাণিসম্পদ অধিদফতর

Read Next

যেসব ভিটামিনের অভাবে প্রায়ই মন খারাপ হয়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular