৫০ বছরের কম বয়সিদের মধ্যে ক্যানসারজনিত মৃত্যুর প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে কোলোরেক্টাল ক্যানসার। অথচ নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে এই রোগটি মৃত্যুর দিক থেকে ছিল পঞ্চম স্থানে।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ক্যানসার সোসাইটি (American Cancer Society)-এর এক প্রতিবেদনে গত তিন দশকে তরুণদের ক্যানসারজনিত মৃত্যুর চিত্র বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে দেখা যায়, এই বয়সি জনগোষ্ঠীর সামগ্রিক ক্যানসারে মৃত্যুহার ৪৪ শতাংশ কমেছে। কিন্তু কোলোরেক্টাল ক্যানসারের ক্ষেত্রে চিত্র ভিন্ন। বরং এই রোগে মৃত্যুহার বেড়েছে। বড় ধরনের ক্যানসারের মধ্যে এটিই একমাত্র, যার মৃত্যুহার কমার বদলে ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে।
৫০ বছরের নিচে সবচেয়ে প্রাণঘাতী পাঁচ ক্যানসার
– মস্তিষ্কের ক্যানসার
– স্তন ক্যানসার
– লিউকেমিয়া
– ফুসফুসের ক্যানসার
– কোলোরেক্টাল ক্যানসার
২০১৪ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে এ তালিকার চারটি ক্যানসারে মৃত্যুহার কমেছে। কিন্তু কোলোরেক্টাল ক্যানসারে ২০০৫ সাল থেকে প্রতি বছর গড়ে ১ দশমিক ১ শতাংশ করে মৃত্যুহার বেড়েছে। ২০২৩ সালে এটি ফুসফুসের ক্যানসারকে ছাড়িয়ে ৫০ বছরের কম বয়সিদের মধ্যে ক্যানসারজনিত মৃত্যুর শীর্ষ কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
তরুণদের মধ্যে কেন বাড়ছে কোলন ক্যানসার
কোলন বা রেকটামে যে ক্যানসার হয় তাকে কোলোরেক্টাল ক্যানসার বলা হয়। কেন তরুণদের মধ্যে এই রোগ বাড়ছে, তার সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো জানা যায়নি। তবে গবেষকরা জীবনযাপন ও পরিবেশগত কিছু কারণের দিকে ইঙ্গিত করছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে
– পর্যাপ্ত ফল, শাকসবজি ও আঁশযুক্ত শস্য না খাওয়া
– অতিরিক্ত লাল মাংস, বিশেষ করে ধূমায়িত বা প্রক্রিয়াজাত মাংস খাওয়া
– স্থূলতা বৃদ্ধি
– কম শারীরিক পরিশ্রম
এসব কারণে ঝুঁকি বাড়তে পারে। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে স্থূলতার হার বাড়ছে, যা কোলোরেক্টাল ক্যানসারের ঝুঁকির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
আরেকটি বিষয় হলো, আমরা যা খাই তার সবকিছুই শেষ পর্যন্ত কোলনের মধ্য দিয়ে যায়। ফলে খাদ্যাভ্যাস ও অন্ত্রের স্বাস্থ্য ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত।
দেরিতে ধরা পড়ায় বাড়ছে মৃত্যুহার
প্রতিবেদন বলছে, ৫০ বছরের কম বয়সি চার রোগীর মধ্যে তিনজনের ক্যানসার ধরা পড়ে তখন, যখন রোগটি অনেকটাই ছড়িয়ে গেছে। প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা গেলে বাঁচার সম্ভাবনা অনেক বেশি।
Centers for Disease Control and Prevention-এর তথ্য অনুযায়ী, একেবারে শুরুর পর্যায়ে ক্যানসার ধরা পড়লে প্রায় ৮৯ শতাংশ রোগী কমপক্ষে পাঁচ বছর বেঁচে থাকেন। কিন্তু একেবারে শেষ পর্যায়ে ধরা পড়লে সেই হার নেমে আসে ১৬ শতাংশে।
গবেষণায় দেখা গেছে, উপসর্গ দেখা দেওয়ার পর রোগ নির্ণয় হতে গড়ে চার থেকে ছয় মাস সময় লেগে যায়।
সাধারণ সতর্কসংকেতগুলো হলো
– পেটব্যথা
– পায়খানার সঙ্গে রক্ত যাওয়া
– দীর্ঘদিন ডায়রিয়া বা কোষ্ঠকাঠিন্য
এ ছাড়া অকারণে ওজন কমে যাওয়া, দীর্ঘদিন ক্লান্তি, বা পায়খানা সম্পূর্ণ হয়নি এমন অনুভূতিও লক্ষণ হতে পারে।
কারা আগে থেকেই পরীক্ষা করাবেন
সাধারণভাবে ৪৫ বছর বয়স থেকে নিয়মিত স্ক্রিনিং শুরু করার পরামর্শ দেওয়া হয়। তবে কারও পরিবারের সদস্য কম বয়সে কোলন ক্যানসারে আক্রান্ত হলে তার ১০ বছর আগেই পরীক্ষা শুরু করা উচিত। যেমন, কারও মায়ের ৪৫ বছর বয়সে ক্যানসার ধরা পড়লে সন্তানের ৩৫ বছরেই স্ক্রিনিং শুরু করা প্রয়োজন।
পরিবারে পেট, অগ্ন্যাশয় বা স্তন ক্যানসারের ইতিহাস থাকলেও ঝুঁকি বাড়ে। কিছু জেনেটিক পরিবর্তন এবং দীর্ঘমেয়াদি অন্ত্রের প্রদাহজনিত রোগ যেমন ক্রোনস ডিজিজ বা আলসারেটিভ কোলাইটিস থাকলেও ঝুঁকি বেশি।
এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে আদিবাসী ও আলাস্কা নেটিভ জনগোষ্ঠীর মধ্যে এ রোগের হার বেশি। কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষদের মৃত্যুঝুঁকিও তুলনামূলকভাবে বেশি।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এখনো কোলোরেক্টাল ক্যানসার নিয়ে সচেতনতা তুলনামূলক কম। অনেকেই উপসর্গকে সাধারণ গ্যাস্ট্রিক বা অর্শরোগ ভেবে এড়িয়ে যান। ফলে দেরিতে রোগ ধরা পড়ে। তাই পরিবারে ক্যানসারের ইতিহাস থাকলে তা চিকিৎসককে জানানো এবং সময়মতো কোলনোস্কপি বা অন্যান্য পরীক্ষা করা জরুরি।
লজ্জা ও ভুল ধারণা বড় বাধা
অনেকেই পায়খানা বা অন্ত্রের সমস্যার কথা বলতে সংকোচ বোধ করেন। এই সামাজিক অস্বস্তি অনেক সময় দেরিতে রোগ ধরা পড়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, অন্ত্রের স্বাস্থ্য নিয়ে খোলামেলা আলোচনা দরকার। পায়খানার অভ্যাসে বড় পরিবর্তন হলে বা রক্ত গেলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
কিছু চিকিৎসকও কম বয়সিদের ক্ষেত্রে ক্যানসারের সম্ভাবনা গুরুত্ব দেন না। ফলে উপসর্গকে সাধারণ সমস্যা ভেবে সময় নষ্ট হয়। কিন্তু উপসর্গ থাকলে এবং ঝুঁকি বেশি হলে দ্বিতীয় মতামত নেওয়াও প্রয়োজন হতে পারে।
প্রতিরোধে জীবনযাপনের পরিবর্তন
গবেষণা বলছে, কিছু অভ্যাস পরিবর্তন করলে ঝুঁকি কমানো সম্ভব। যেমন—
– লাল ও প্রক্রিয়াজাত মাংস কম খাওয়া
– বেশি শাকসবজি, ফল ও আঁশযুক্ত খাবার খাওয়া
– নিয়মিত ব্যায়াম
– স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা
– অ্যালকোহল কম পান করা
– তামাক বর্জন
বিশেষজ্ঞদের মতে, আজকের সঠিক জীবনযাপন ভবিষ্যতের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে।
কোলোরেক্টাল ক্যানসার অনেক ক্ষেত্রেই প্রতিরোধযোগ্য এবং প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে চিকিৎসাযোগ্য। কিন্তু দেরিতে শনাক্ত হলে ঝুঁকি মারাত্মকভাবে বেড়ে যায়। তরুণদের মধ্যে এই রোগ বাড়তে থাকা একটি উদ্বেগজনক বার্তা দিচ্ছে।
উপসর্গকে অবহেলা না করা, পরিবারে রোগের ইতিহাস জানা, সময়মতো স্ক্রিনিং করা এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। সচেতনতা ও দ্রুত পদক্ষেপই পারে বহু অকালমৃত্যু রোধ করতে।
সূত্র: হেল্থ লাইন
