মহানবী (সা.) রমজানের দিনগুলো যেভাবে কাটাতেন

মুসলিম উম্মাহর কাছে আত্মশুদ্ধি ও ত্যাগের মাস পবিত্র রমজান। সিয়াম সাধনার এই দিনগুলোতে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনযাপন কেমন ছিল, তা জানার আগ্রহ রয়েছে প্রত্যেক মুমিনের। তিনি কীভাবে সেহরি খেতেন, কীভাবে ইফতার করতেন কিংবা সারাদিন কীভাবে ইবাদতে মগ্ন থাকতেন, তা নিয়ে কৌতূহলের শেষ নেই। রাসুল (সা.)-এর পবিত্র সুন্নাহর আলোকে রমজানে তার দৈনন্দিন রুটিন ও আমলের একটি চিত্র এখানে তুলে ধরা হলো।

সেহরি ও ফজরের প্রস্তুতি

মহানবী (সা.) রমজানে প্রতিদিনই রোজা রাখার নিয়ত করতেন এবং অত্যন্ত সাধারণ খাবারের মাধ্যমে সেহরি সম্পন্ন করতেন। কখনো সামান্য খাবার ও পানি, আবার কখনো শুধু কয়েকটি খেজুর খেয়েই তিনি সেহরি সারতেন।

সেহরি শেষে তিনি ফজরের সালাতের প্রস্তুতি নিতেন। বর্ণিত আছে যে, তার সেহরি গ্রহণ ও সালাতের মধ্যবর্তী সময়ের ব্যবধান ছিল মাত্র ৫০টি আয়াত তিলাওয়াত করার মতো সময়।

সেহরির পর তিনি ঘরেই দুই রাকাত সুন্নত নামাজ আদায় করতেন এবং বেলাল (রা.) ইকামত দেওয়ার আগ পর্যন্ত ঘরেই অপেক্ষা করতেন। এরপর তিনি মসজিদে গিয়ে জামাতের সঙ্গে ফজরের নামাজ আদায় করতেন।

দিনের শুরু ও ইবাদত

ফজরের নামাজের পর সূর্যোদয় পর্যন্ত মহানবী (সা.) মসজিদে বসে আল্লাহর জিকিরে মগ্ন থাকতেন। সূর্যোদয়ের প্রায় ২০ মিনিট পর তিনি দুই রাকাত নামাজ (ইশরাক) আদায় করতেন। তিনি বলতেন, যে ব্যক্তি এভাবে ইবাদত করবে, সে একটি পূর্ণ হজ ও ওমরাহর সওয়াব লাভ করবে।

পারিবারের সঙ্গে সময় ও সদাচার

মহানবী (সা.) রমজান মাসেও তার পরিবারের সদস্যদের প্রতি অত্যন্ত সদয় ছিলেন। তিনি ঘরের কাজে সহযোগিতা করতেন এবং স্ত্রীদের সঙ্গে সময় কাটাতেন। রোজা থাকা অবস্থায়ও তিনি স্ত্রীদের প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শন করতেন।

ইফতার ও মাগরিব

ইফতারের সময় মাগরিবের আজানের আগে মহানবী (সা.) দোয়া ও মোনাজাতে মশগুল হতেন। আজান হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি বিলম্ব না করে ইফতার করতেন।

আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) মাগরিবের নামাজের আগে কয়েকটি তাজা খেজুর দিয়ে ইফতার করতেন। তাজা খেজুর না থাকলে শুকনো খেজুর আর তাও না থাকলে তিন ঢোক পানি পান করে ইফতার শেষ করতেন। এরপর মাগরিবের ফরজ নামাজ আদায় করে ঘরে ফিরে সুন্নত নামাজ পড়তেন। এশা পর্যন্ত সময়টুকু তিনি তার স্ত্রীদের সঙ্গে কাটাতেন।

তারাবি ও তাহাজ্জুদ

মহানবী (সা.) তিন রাত সাহাবিদের সঙ্গে নিয়ে জামাতে তারাবি আদায় করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে এটি উম্মতের ওপর ফরজ হয়ে যাওয়ার ভয়ে তিনি ঘরেই নামাজ আদায় শুরু করেন।
আয়েশা (রা.)-এর বর্ণনা অনুযায়ী, রমজান বা রমজানের বাইরে তিনি রাতে ১১ রাকাতের বেশি নামাজ পড়তেন না। তিনি অত্যন্ত ধীরস্থিরভাবে দীর্ঘ সময় নিয়ে এই নামাজ আদায় করতেন। রাতের শেষাংশে বিতর নামাজের আগে তিনি কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে নিতেন।

দানশীলতা ও তিলাওয়াত

রমজান মাস এলে মহানবী (সা.)-এর দানশীলতা বহুগুণ বেড়ে যেত। সাহাবিরা তার এই দানকে ‘প্রবহমান বাতাসের’ সঙ্গে তুলনা করতেন। অভাবীদের সহায়তায় তিনি ছিলেন ক্ষিপ্র গতির। এছাড়া পুরো মাসে তিনি প্রচুর কুরআন তিলাওয়াত, জিকির ও দীর্ঘ সময় মোনাজাতে ব্যয় করতেন।

মহানবী (সা.) মাঝে মাঝে বিরতিহীনভাবে রোজা রাখতেন (সওমে বিসাল), তবে উম্মতকে এমনটি করতে নিষেধ করেছেন।

শেষ দশকের ইতেকাফ ও কদরের রাত

রমজানের শেষ দশ দিন মহানবী (সা.) মসজিদে ইতেকাফ করতেন। তার ওফাতের বছর তিনি টানা ২০ দিন ইতেকাফ করেছিলেন। এই দিনগুলোতে তিনি সারা রাত জেগে ইবাদত করতেন এবং পরিবারের সদস্যদেরও ইবাদতের জন্য জাগিয়ে দিতেন। বিশেষ করে শেষ দশ দিনের বিজোড় রাতে তিনি লাইলাতুল কদর তালাশ করতে বলতেন।

আয়েশা (রা.)-কে তিনি কদরের রাতে এই দোয়াটি পড়তে শিখিয়েছিলেন, হে আল্লাহ, আপনি ক্ষমাশীল, ক্ষমা করতে ভালোবাসেন, তাই আমাকে ক্ষমা করুন।

রাসুল (সা.)-এর রমজানের এই রুটিন আমাদের শেখায় যে, রমজান শুধু খাওয়া-দাওয়ার উৎসব নয়, বরং এটি মহান আল্লাহর আনুগত্য ও ইবাদতের বসন্তকাল। তিনি একজন আদর্শ স্বামী ও নেতা হিসেবে পরিবারকে আল্লাহর পথে পরিচালিত করার যে দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন, তা প্রতিটি মুসলিমের জন্য অনুকরণীয়।

Read Previous

আগামী সপ্তাহে ৪ বিভাগে বজ্রসহ বৃষ্টির পূর্বাভাস

Read Next

ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনে ডিএমপির ১৩৩৮ মামলা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular