ইরানকে ঘিরে সম্ভাব্য নতুন সামরিক পদক্ষেপের খবরে বিশ্ববাজারে তেলের দাম হঠাৎই তীব্রভাবে বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নতুন হামলার পরিকল্পনা নিয়ে ব্রিফ করা হতে পারে- এমন প্রতিবেদনের পরই বাজারে অস্থিরতা বাড়ে। আর এই পরিস্থিতি জ্বালানি সরবরাহ ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নতুন চাপের আশঙ্কা তৈরি করেছে।
সংবাদমাধ্যম বিবিসি বলছে, ইরান যুদ্ধ নিয়ে নতুন সম্ভাব্য পদক্ষেপের পরিকল্পনা নিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ব্রিফ করা হতে পারে বলে প্রতিবেদন সামনে আসার পর বিশ্ববাজারে তেলের দাম ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) ইরানের বিরুদ্ধে ‘স্বল্প সময়ের কিন্তু শক্তিশালী’ হামলার একটি পরিকল্পনা প্রস্তুত করেছে। মূলত তেহরানের সঙ্গে আলোচনায় চলমান অচলাবস্থার কারণেই সামনে আনা হয়েছে এই পরিকল্পনা। এ বিষয়ে বিবিসি সেন্ট্রাল কমান্ড ও হোয়াইট হাউসের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম এক পর্যায়ে প্রায় ৭ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১২৬ ডলারের বেশি হয়েছে। ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর পর এটিই সর্বোচ্চ দাম। মূলত শান্তি আলোচনা স্থবির হয়ে পড়া এবং জ্বালানি পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ থাকায় চলতি সপ্তাহে জ্বালানি দামের ওপর চাপ বেড়েছে।
এদিকে এশিয়ার বাজারে এক পর্যায়ে ব্রেন্টের দাম ১২৬.৩১ ডলার ছুঁলেও ইউরোপীয় বাজারের শুরুতে তা কমে প্রায় ১২২ ডলারে নেমে আসে। মূলত ক্রুড অয়েল পেট্রোল ও ডিজেলের প্রধান উপাদান। ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এর দাম বাড়ায় বিভিন্ন দেশে জ্বালানির খুচরা মূল্যও বেড়েছে।
যুক্তরাজ্যে বর্তমানে পেট্রোলের গড় দাম প্রতি লিটার ১৫৭ পেনি, যা যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় ২৪ পেনি বেশি। ডিজেলের দাম প্রায় ১৮৯ পেনি, যা আগের তুলনায় ৪৬ পেনি বেশি। অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্ভাব্য হামলার পরিকল্পনায় বিভিন্ন অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে।
হরমুজে তিনটি জাহাজে হামলা, আন্তর্জাতিক বাজারে বাড়ল তেলের দাম
আরেকটি পরিকল্পনায় হরমুজ প্রণালির একটি অংশ নিয়ন্ত্রণে নিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল পুনরায় চালুর কথা বলা হয়েছে। আর সেটির জন্য স্থলবাহিনী মোতায়েনের প্রয়োজন হতে পারে।
জুন ডেলিভারির বর্তমান ব্রেন্ট ফিউচার চুক্তির মেয়াদ বৃহস্পতিবার শেষ হবে। বেশি লেনদেন হওয়া জুলাই চুক্তির দাম প্রায় ১.৭ শতাংশ বেড়ে প্রায় ১১২ ডলারে দাঁড়িয়েছে। ফিউচার চুক্তি হলো নির্দিষ্ট তারিখে কোনও সম্পদ কেনা বা বিক্রির পূর্বনির্ধারিত চুক্তি।
নানইয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটির অর্থনীতির অধ্যাপক ইয়াও হুই চুয়া বলেন, উপসাগরীয় অঞ্চলে সম্ভাব্য সামরিক উত্তেজনার ইঙ্গিতেই তেল ব্যবসায়ীরা দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন। তিনি বলেন, সংঘাত সামান্য বাড়ার আশঙ্কাও বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, তেহরান যতদিন হরমুজ প্রণালি ব্যবহারকারী জাহাজকে হুমকি দেবে, ততদিন ইরানের বন্দরগুলো অবরোধ করে রাখা হবে। আর এটিই বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। এর জবাবে ইরান ওই প্রণালিতে জাহাজে হামলার হুমকি দিয়েছে। বিশ্বে মোট জ্বালানির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়েই পরিবাহিত হয়।
এর আগে বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি অবরোধের প্রস্তুতির খবরে তেলের দাম ৬ শতাংশ বেড়েছিল। কেপলারের জ্যেষ্ঠ তেল বিশ্লেষক নবীন দাস বলেন, ‘যুদ্ধ আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা আবার সামনে এসেছে, হোক তা যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ অব্যাহত রাখা বা ইরানের ওপর সম্ভাব্য নতুন হামলা।’
তিনি বিবিসিকে বলেন, তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১২৫ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছালে ব্যবসায়ী ও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়তে শুরু করে। তিনি আরও বলেন, ‘দামের এই ঊর্ধ্বগতি শুধু তেল নয়, তেল-সম্পর্কিত পণ্য, মূল্যস্ফীতি এবং দৈনন্দিন জীবনের প্রায় সব ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলে।’
বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা, তেলের দাম আরও বেড়ে ছাড়াল ১১১ ডলার
বিবিসি বলছে, জ্বালানি খাতের কর্মকর্তারা মঙ্গলবার ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করে যুদ্ধের প্রভাব কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তাদের ওপর কমানো যায়, তা নিয়ে আলোচনা করেছেন। এতে বাজারে দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা আরও বেড়েছে।
এদিকে এশিয়ার শেয়ারবাজারে পতন হয়েছে। জাপানের নিক্কেই সূচক ১.১ শতাংশ এবং দক্ষিণ কোরিয়ার কসপি ১.৪ শতাংশ কমে গেছে। লন্ডনের এফটিএসই ১০০ সূচক স্থির থাকলেও জার্মানির ডিএএক্স ০.৬ শতাংশ এবং ফ্রান্সের সিএসি ১.২ শতাংশ কমেছে।
