পৃথিবীর শুরু থেকেই জীবিকার তাগিদে সৃষ্টি হয় কর্মক্ষেত্রের। মেহনতি মানুষ জীবিকার প্রয়োজনে অন্যের জমিতে, প্রতিষ্ঠানে শ্রম দিয়ে থাকেন। কেউ মালিক, কেউ শ্রমিক হিসেবে পরিচিত। বিস্ময়ের কথা হচ্ছে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শ্রমিকরা অবহেলিত হন। শ্রমের মূল্য ঠিকমতো পান না। শ্রমিক ও মালিকের সম্পর্ক, কর্তব্য ও অধিকার সুস্পষ্টভাবে কোরআন ও হাদিসে রয়েছে।
ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে সম্পদের সার্বভৌমত্ব ও মালিকানা একমাত্র মহান আল্লাহর। মানুষ তার তত্ত্বাবধায়ক মাত্র। মালিক-শ্রমিকের সম্পর্ক ভাই ভাই। তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক হবে শ্রদ্ধা-স্নেহ, সৌহার্দ্য ও বিশ্বস্ততায় ভরপুর। একে অপরের কল্যাণ কামনা করবেন।
ইসলামে শ্রমিকের মর্যাদা ও অধিকার সম্পর্কে বহু নির্দেশনা রয়েছে। শ্রমের প্রতি উৎসাহ দিয়ে পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে,
فَاِذَا قُضِیَتِ الصَّلٰوۃُ فَانۡتَشِرُوۡا فِی الۡاَرۡضِ وَ ابۡتَغُوۡا مِنۡ فَضۡلِ اللّٰهِ وَ اذۡكُرُوا اللّٰهَ كَثِیۡرًا لَّعَلَّكُمۡ تُفۡلِحُوۡنَ অর্থ: অতঃপর যখন নামাজ পূর্ণ করা হবে, তখন জমিনে ছড়িয়ে পড়ো; আর আল্লাহকে অধিক মাত্রায় স্মরণ করো, আশা করা যায় তোমরা সফল হবে। (সুরা জুমুআহ: ১০)
ইসলামে শ্রমিক ও মালিক পরস্পরকে ভাই সম্বোধন করে মূলত ইসলাম শ্রেণি ও বর্ণ বৈষম্যের বিলোপ করেছে। তবে শ্রেণিবৈষম্য বিলোপের নামে মালিক ও উদ্যোক্তার মেধা, শ্রম ও সামাজিক পদ মর্যাদাকে অস্বীকার করেনি ইসলাম। চাপিয়ে দেয়নি নিপীড়নমূলক কোনো ব্যবস্থা। বরং তার ভেতর মানবিক মূল্যবোধ ও শ্রমিকের প্রতি মমতা জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করেছে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে,
وَ اللّٰهُ فَضَّلَ بَعۡضَكُمۡ عَلٰی بَعۡضٍ فِی الرِّزۡقِ ۚ فَمَا الَّذِیۡنَ فُضِّلُوۡا بِرَآدِّیۡ رِزۡقِهِمۡ عَلٰی مَا مَلَكَتۡ اَیۡمَانُهُمۡ فَهُمۡ فِیۡهِ سَوَآءٌ ؕ اَفَبِنِعۡمَۃِ اللّٰهِ یَجۡحَدُوۡنَ অর্থ: আল্লাহ তাআলা জীবনোপকরণে তোমাদের কাউকে কারো ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন। যাদের শ্রেষ্ঠত্ব দেয়া হয়েছে তারা তাদের অধীন দাস-দাসীদের নিজেদের জীবনোপকরণ থেকে এমন কিছু দেয় না যাতে তারা তাদের সমান হয়ে যায়। তবে কি তারা আল্লাহর অনুগ্রহ অস্বীকার করে? (সুরা নাহল: ৭১)
ইসলামে শ্রমের ক্ষেত্রে মালিক ও শ্রমিকের জন্য অভিন্ন খাবার ও বস্ত্রের নির্দেশ দিয়েছে। ইসলাম একটি উচ্চ মানসিকতাসম্পন্ন শ্রমনীতির কথা বলেছে– যেখানে শ্রমিকের মানসম্মত জীবন-জীবিকা নিশ্চিত হয়। নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তারা তোমাদের ভাই।
আল্লাহ তাদের তোমাদের অধীন করেছেন। সুতরাং যার ভাইকে তার অধীন করেছেন সে যেন তাকে তাই খাওয়ায় যা সে খায়, সে কাপড় পরিধান করায়, যা সে পরিধান করে। তাকে সামর্থ্যের বেশি কোনো কাজের দায়িত্ব দেবে না। যদি এমনটা করতেই হয়, তাহলে সে যেন তাকে সাহায্য করে। (বুখারি: ৫৬১৭)
উপযুক্ত বেতন ও পারিশ্রমিক কর্মজীবীর অধিকার। ইসলাম দ্রুততম সময়ে তা আদায়ের নির্দেশ দিয়েছে। নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ঘাম শুকানোর আগেই শ্রমিকের পারিশ্রমিক দিয়ে দাও। (ইবনে মাজাহ: ২৪৪৩০)
শ্রমিককে ঠকানো ইসলামের দৃষ্টি জঘন্যতম পাপ। শ্রমিক তার প্রাপ্য সম্পর্কে ওয়াকিবহাল না হলেও মালিক তাকে প্রাপ্য বুঝিয়ে দেবে। নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ব্যাপারে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, যে জাতির দুর্বল লোকেরা জোর-জবরদস্তি ছাড়া তাদের পাওনা আদায় করতে পারে না সেই জাতি কখনো পবিত্র হতে পারে না। (ইবনে মাজাহ: ২৪২৬)
