লিচুর দাম কেন ১৫০০ টাকা

‘ঈশা খাঁর আমলে নাকি ১ টাকায় ৮ মণ চাল পাওয়া যেতো। এখন ঈশা খাঁর আমল নেই, এমন এক আমল চলছে যে লিচুর মতো ফল কিনে খেতে হবে ১৫০০ টাকা দিয়ে। এ তো মেনে নেওয়া যায় না।’ রাজধানীর মতিঝিলে চায়না থ্রি লিচু কিনতে এসে দাম শুনে এভাবেই ক্ষোভ ঝাড়ছিলেন একজন ক্রেতা।

বিক্রেতার উত্তর ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট, ‘পাঙ্গাস মাছও মাছ, ইলিশ মাছও মাছ; আপনি ইলিশ না খাইয়া পাঙ্গাস খান, কম দামে পাইবেন।’ এভাবেই ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে কিছুক্ষণ দরদামের লড়াই চলে।

দীর্ঘ তর্ক-বিতর্কের পর, শেষমেশ ৩৬০ টাকায় বোম্বাই জাতের একশো লিচু নিলেন সেই ক্রেতা। তবে তার মনে তখনও চায়না থ্রি লিচু না কিনতে পারার ক্ষোভ, ‘কী এমন আছে এই লিচুর মধ্যে যে ১০০টা লিচুর জন্য গুনতে হবে ১৫০০ টাকা অর্থাৎ একটা লিচু ১৫ টাকা দিয়ে কিনে খেতে হবে? না, এটা হতে পারে না।’

অবশ্য একই জাতের তুলনামূলক কিছুটা ছোট সাইজের লিচু ১ হাজার টাকায় বিক্রি করতে দেখা গেছে। আর এর কাছাকাছি দেখতে, তুলনামূলক মসৃণ এবং স্বাদেও কিছুটা ভিন্ন ‘বেদানা’ জাতের লিচু বিক্রি হচ্ছে ৮০০ টাকা দরে।

দাম নিয়ে ক্রেতাদের এমন ক্ষোভের মুখে বিক্রেতা মোহাম্মদ হোসেনের নমনীয় উত্তর, ‘আমরা কিনা বেচি স্যার, আমগো কী করার আছে।’

তার কাছেই যখন জানতে চাওয়া হলো, চায়না থ্রি লিচুর কেন আকাশচুম্বী দাম? বিক্রেতার উত্তর, ‘এর বিচি ছোট, মাংস বেশি, রসালো ও মিষ্টি বেশি, স্বাদও চমৎকার; আর সাইজ তো আছেই।’

তবে সবকিছু মিলিয়ে তবুও ১০০ লিচুর দাম ১৫০০ টাকা অনেকটাই বেশি হয়ে যায় বলে মন্তব্য করলেন এই কথোপকথন শুনতে থাকা আশপাশের কয়েকজন পথচারী।

জাতভেদে দামের এই বিপুল পার্থক্যে নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়। মোহাম্মদ সেলিম নামের একজন লিচুপ্রেমী ব্যাংক কর্মকর্তা বলেন, ‘কিছু মানুষ আছে যারা যেখানেই যাবে, সবসময় সেরা জিনিসটাই চায়। আর সেই আভিজাত্য প্রিয় মানুষের চাহিদার কারণেই মূলত এই লিচু চড়া দামে বিক্রি হয়। তবে সাধারণ লিচুর সাথে এর গুণের পার্থক্যটা অস্বীকার করা যায় না, এটা যেমন সত্যি; তেমনি দামটাও সেই গুণাগুণ অনুযায়ী সর্বোচ্চ ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা হওয়া উচিত ছিল। এর চেয়ে বেশি নেয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়।’ এছাড়া অন্যান্য জাতের লিচুর দাম তুলনামূলক খুব বেশি না বলেই মনে করেন এই ক্রেতা।

এদিকে রাজধানীর কারওয়ান বাজারের পাইকারি ব্যবসায়ী ও আড়তদারদের দাবি, সরবরাহ বেশি থাকায় লিচুর দাম এখন কিছুটা সহনীয়। তারা বলেন, ‘টানা কয়েকদিনের বৃষ্টির পর হঠাৎ কড়া রোদ আর তীব্র গরমে একদিকে অনেক লিচু নষ্ট হয়েছে। অন্যদিকে একবারে সব লিচু পেকে যাওয়ায় বাজারে জোগান বেড়েছে। ফলে লিচুর দাম এখন কিছুটা সহনীয় আছে। তবে তিন-চারদিন পরেই লিচুর দাম আরও বাড়বে।’

দামের এই মনস্তাত্ত্বিক ও ভৌগোলিক বিষয়টি আরও একটু পরিষ্কার করে জানালেন কৃষি মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা মোহাম্মদ আরিফুর রহমান। তিনি বলেন, ‘এখানে যেমন সেরাটা পাওয়ার মনস্তত্ত্ব কাজ করছে, তেমনি কিছু বাস্তবসম্মত কারণও আছে। তা হলো, উচ্চমানের ‘চায়না থ্রি’ জাতটি মূলত সুনির্দিষ্টভাবে দিনাজপুর অঞ্চল থেকেই বেশি পাওয়া যায়। এর বাইরে পাবনা ও ঈশ্বরদীতেও কিছু পরিমাণ উৎপাদিত হচ্ছে। এত দূর থেকে লিচু আনতে পরিবহন খরচ বেশি হচ্ছে। যা দামেও প্রভাব ফেলছে। তবে একটি চায়না থ্রি লিচুতে যে পরিমাণ মাংস বা শ্বাস থাকে তা বোম্বাই লিচুর প্রায় দুটির সমান। সেই হিসেবে এর দাম বোম্বাই’র দ্বিগুণের কিছুটা কম হওয়ার কথা।

উৎপাদনের তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, ‘ফলনের দিক থেকে এবার খুব একটা তারতম্য দেখা যায়নি। একটি বোম্বাই লিচু গাছে যে পরিমাণ ফলন পাওয়া যায়। চায়না থ্রি লিচু গাছে সংখ্যায় কম হলেও ওজনে প্রায় সমান।
লিচু বিক্রির ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে ঢাকার মিরপুর-১ ও মাজার রোড এলাকায়। সেখানে ঝোপা বা শ হিসেবে নয়, লিচু বিক্রি হচ্ছে কেজি দরে। এতে মান ও আকার ভেদে প্রতি কেজি বোম্বাই লিচুর দাম পড়ছে ১৪০ থেকে ২০০ টাকা। এতে দামের খুব একটা তারতম্য না হলেও ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ই খুশি।

Read Previous

২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৮ শিশুর মৃত্যু

Read Next

বৃষ্টি হলে সবাই খিচুড়ি খেতে চায় কেন?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular