দীর্ঘ ১১ বছরের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নবম পে-স্কেল বা নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আগামী জুলাই থেকে ধাপে ধাপে এই বর্ধিত সুবিধা কার্যকর হতে পারে-এমন খবরে যখন সরকারি দফতরে আনন্দের হাওয়া, ঠিক তখনই দেশের সিংহভাগ মানুষের মনে উঁকি দিচ্ছে একটি বড় প্রশ্ন।
সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির এই মহোৎসবের বিপরীতে দেশের অর্থনীতি সচল রাখা কোটি কোটি বেসরকারি চাকরিজীবীর ভবিষ্যৎ কী? নতুন পে-স্কেলের আলো কি কোনোভাবে পৌঁছাবে বেসরকারি খাতের অন্ধকার কোণে, নাকি তারা পাবেন শুধু নতুন করে বাড়তে থাকা মূল্যস্ফীতির চাপ?
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, এবারের পে-স্কেল একযোগে নয়, বরং ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হতে পারে। প্রথম পর্যায়ে সংশোধিত মূল বেতনের একটি অংশ এবং পরবর্তী সময়ে অন্যান্য ভাতা সমন্বয়ের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এই উদ্যোগে জনপ্রশাসনে কর্মদক্ষতা ও জবাবদিহি বৃদ্ধির আশা করা হলেও, দেশের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৯৫ শতাংশ ধরে রাখা বেসরকারি খাতের কর্মীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে।
বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বলছে: শিল্প, তৈরি পোশাক, সেবা, তথ্যপ্রযুক্তি, ব্যাংকিং ও গণমাধ্যমসহ অর্থনীতির সব প্রধান চালিকাশক্তিই বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভরশীল। অথচ বছরের পর বছর ধরে এই বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য গড়ে ওঠেনি কোনো সমন্বিত চাকরি-নীতিমালা, সুনির্দিষ্ট বেতনকাঠামো কিংবা কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা। কয়েক বছর আগে বেসরকারি খাতের জন্য একটি খসড়া ‘সার্ভিস রুলস’ তৈরির উদ্যোগ নেয়া হলেও তা আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আজও আলোর মুখ দেখেনি।
সম্প্রতি বিষয়টি জাতীয় সংসদে উত্থাপিত হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন করে ঝড় উঠেছে। বেসরকারি চাকরিজীবীদের একটি বড় অংশের দাবি–সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের পাশাপাশি বেসরকারি কর্মীদের জন্যও ন্যূনতম কর্মসংস্থানের মানদণ্ড, চাকরির নিরাপত্তা, উৎসব ভাতা ও সার্বিক শ্রমবান্ধব নীতিমালা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
এ বিষয়ে সরকারের এক শীর্ষ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে গণমাধ্যমকে জানান, সরকারি চাকরিজীবীদের পে-স্কেলের বিষয়টি মোটামুটি চূড়ান্ত হলেও বেসরকারি খাতের জন্য তাৎক্ষণিক কোনো সুবিধার রূপরেখা এই মুহূর্তে নেই। তবে বেসরকারি কর্মীদের সুরক্ষায় শ্রম নীতিমালা সংস্কারের দাবিগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হতে পারে।
সরকারি পে-স্কেলের জোয়ারে বেসরকারি কর্মজীবীদের নৌকো কতটুকু ভাসবে, নাকি বৈষম্যের দেয়াল আরও স্পষ্ট হবে-তা সময়ই বলে দেবে। তবে দেশের বৃহৎ এই জনশক্তিকে সুরক্ষাহীন রেখে টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন কতটা সম্ভব, সেই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে সচেতন মহলে।
