ইসলামে মসজিদ কেবল নামাজ আদায়ের স্থান নয়; বরং এটি একটি আদর্শ সমাজ গঠনের প্রাণকেন্দ্র। রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করেন, তখন সর্বপ্রথম যে কাজগুলোর প্রতি গুরুত্ব দেন, তার অন্যতম ছিল মসজিদ নির্মাণ। কারণ তিনি জানতেন, একটি জাতির ঈমান, চরিত্র, শিক্ষা, ঐক্য, নেতৃত্ব ও সভ্যতার ভিত্তি মসজিদ থেকেই নির্মিত হয়।
আজ মুসলিম সমাজের নানা সংকট নৈতিক অবক্ষয়, পারিবারিক ভাঙন, যুবসমাজের বিপথগামিতা, সামাজিক বিভক্তি ও দ্বীনি অজ্ঞতার অন্যতম কারণ হলো মসজিদকে সমাজজীবনের কেন্দ্র থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া। অথচ ইসলামের ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, মসজিদকেন্দ্রিক সমাজই ছিল সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতার ভিত্তি।
মসজিদ প্রতিষ্ঠা তাকওয়ার ভিত্তিতে
আল্লাহ তাআলা বলেন,
لَمَسْجِدٌ أُسِّسَ عَلَى التَّقْوَى مِنْ أَوَّلِ يَوْمٍ أَحَقُّ أَنْ تَقُومَ فِيهِ যে মসজিদের ভিত্তি প্রথম দিন থেকেই তাকওয়ার ওপর প্রতিষ্ঠিত, সেখানে দাঁড়ানোই অধিক উপযুক্ত। (সুরা তাওবা:১০৮) এই আয়াত প্রমাণ করে যে, ইসলামি সমাজের ভিত্তি তাকওয়া, আর সেই তাকওয়ার প্রশিক্ষণকেন্দ্র হলো মসজিদ।
মসজিদ ছিল নববী রাষ্ট্রের কেন্দ্র
মদিনায় পৌঁছে রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সর্বপ্রথম মসজিদে নববী নির্মাণ করেন। এই মসজিদ থেকেই পরিচালিত হতো
১.পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ২. কোরআন শিক্ষা ৩.সাহাবিদের প্রশিক্ষণ ৪.বিচারকার্য ৫.রাষ্ট্র পরিচালনা ৬.যুদ্ধ ও শান্তির পরিকল্পনা ৭.বিদেশি প্রতিনিধি গ্রহণ ৮.দরিদ্রদের সহায়তা ৯.সামাজিক সমস্যা সমাধান
অর্থাৎ মসজিদ ছিল রাষ্ট্র, সমাজ ও সভ্যতার কেন্দ্রবিন্দু।
মসজিদ মানুষকে গড়ে তোলে
আল্লাহ বলেন, إِنَّمَا يَعْمُرُ مَسَاجِدَ اللَّهِ مَنْ آمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ আল্লাহর মসজিদগুলো তো তারাই আবাদ করে, যারা আল্লাহ ও আখিরাতের প্রতি ঈমান রাখে। (সুরা তাওবা:১৮) মসজিদ মানুষের অন্তরে ঈমান, তাকওয়া, দায়িত্ববোধ, ভ্রাতৃত্ব ও আল্লাহভীতি সৃষ্টি করে।
মসজিদ শিক্ষার সর্বপ্রথম বিশ্ববিদ্যালয়
রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মসজিদেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল আসহাবে সুফফা। এখান থেকেই বেরিয়ে এসেছিলেন আবু হুরাইরা রা. আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রা. উবাই ইবনু কাব রা.-এর মতো জ্ঞানী সাহাবিগণ।
রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, مَنْ سَلَكَ طَرِيقًا يَلْتَمِسُ فِيهِ عِلْمًا سَهَّلَ اللَّهُ لَهُ طَرِيقًا إِلَى الْجَنَّةِ যে ব্যক্তি জ্ঞান অর্জনের পথে চলে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতের পথ সহজ করে দেন। (সহিহ মুসলিম:২৬৯৯)
মসজিদ সামাজিক ঐক্যের কেন্দ্র
মসজিদে ধনী-গরিব, শাসক-প্রজা, আরব-অনারব, কালো-সাদা সবাই একই কাতারে দাঁড়ায়। এখানে কোনো বর্ণ, গোত্র বা অর্থের শ্রেষ্ঠত্ব নেই; শ্রেষ্ঠত্ব কেবল তাকওয়ার।
আল্লাহ বলেন, إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِنْدَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে সম্মানিত সে-ই, যে সবচেয়ে বেশি তাকওয়াবান। (সুরা হুজুরাত:১৩)
মসজিদ চরিত্র গঠনের কারখানা
রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, أَحَبُّ الْبِلَادِ إِلَى اللَّهِ مَسَاجِدُهَا আল্লাহর কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে প্রিয় স্থান হলো মসজিদ।
(সহিহ মুসলিম: ৬৭১) যে ব্যক্তি নিয়মিত মসজিদে যায়, তার অন্তরে বিনয়, শৃঙ্খলা, ধৈর্য ও নৈতিকতা বিকশিত হয়।
যুবসমাজকে মসজিদমুখী করা জরুরি
রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, سَبْعَةٌ يُظِلُّهُمُ اللَّهُ… وَشَابٌّ نَشَأَ فِي عِبَادَةِ اللَّهِ সাত শ্রেণির মানুষকে আল্লাহ তার আরশের ছায়ায় স্থান দেবেন। তাদের একজন হলো সেই যুবক, যে আল্লাহর ইবাদতে বেড়ে উঠেছে। (সহিহ বুখারি:৬৬০, সহিহ মুসলিম: ১০৩১) যুবকদের মসজিদের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা গেলে সমাজের বহু অপরাধ, মাদকাসক্তি ও নৈতিক অবক্ষয় কমে আসতে পারে।
বর্তমান সমাজে করণীয়
আজ মসজিদকে আবার সমাজের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত করতে হবে। এজন্য ১.নিয়মিত কোরআন ও হাদিসের দারস চালু করা। ২.শিশু-কিশোরদের জন্য নৈতিক শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা।৩.যুবকদের নিয়ে ইসলামি পাঠচক্র গঠন করা। ৪.পারিবারিক ও সামাজিক বিরোধ নিষ্পত্তিতে মসজিদের ইতিবাচক ভূমিকা নিশ্চিত করা। ৫.দারিদ্র্য বিমোচন ও মানবসেবামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা।৫.নারী ও পরিবারের জন্য শরিয়তসম্মত শিক্ষা ও সচেতনতামূলক উদ্যোগ গ্রহণ করা। ৬.মসজিদকে দ্বীনি, সামাজিক ও নৈতিক উন্নয়নের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা।
মসজিদকেন্দ্রিক সমাজব্যবস্থা ইসলামের এক অনন্য বৈশিষ্ট্য। রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মসজিদকে কেন্দ্র করেই এমন একটি সমাজ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যেখানে ঈমান ছিল শক্তিশালী, ন্যায়বিচার ছিল প্রতিষ্ঠিত, জ্ঞান ছিল প্রসারিত, ভ্রাতৃত্ব ছিল সুদৃঢ় এবং মানবিক মূল্যবোধ ছিল সর্বোচ্চ মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত। আজ যদি মুসলিম সমাজ পুনরায় মসজিদকে কেবল ইবাদতের স্থান নয়, বরং শিক্ষা, দাওয়াহ, সামাজিক ঐক্য, নৈতিক চরিত্র গঠন ও মানবকল্যাণের কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারে, তবে ইনশাআল্লাহ ব্যক্তি, পরিবার ও রাষ্ট্র সব ক্ষেত্রেই ইতিবাচক পরিবর্তন ফিরে আসবে।
رَبِّ اجْعَلْنِي مُقِيمَ الصَّلَاةِ وَمِنْ ذُرِّيَّتِي ۚ رَبَّنَا وَتَقَبَّلْ دُعَاءِ হে আমার রব! আমাকে ও আমার সন্তানদের নামাজ প্রতিষ্ঠাকারী বানিয়ে দিন। হে আমাদের রব! আমার দোয়া কবুল করুন। (সুরা ইবরাহিম: ৪০)
