বাংলাদেশি পণ্যের ওপর নতুন করে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা যথাযথভাবে কার্যকর না করার অভিযোগে নতুন এ শুল্ক আরোপ করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। একই সঙ্গে প্রতিযোগী ভারত, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, কম্বোডিয়া, পাকিস্তানসহ ৬০ দেশের ওপর শুল্ক আরোপ করা হয়েছে ১০ ও সাড়ে ১২ শতাংশ। প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর তুলনায় কম শুল্ক আরোপ করায় যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের তুলনামূলক সুবিধা আরও বাড়বে বলে মনে করছে বাংলাদেশ সরকার।
নতুন এই শুল্ক আরোপ করেছে মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির কার্যালয় (ইউএসটিআর)। গত বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রেজিস্ট্রারের এক নোটিশে নতুন এই শুল্ক ঘোষণা করা হয়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের পথে থাকা পণ্য ২৮ জুলাই রাত ১২টা ১ মিনিট পর্যন্ত এই শুল্কহার থেকে অব্যাহতি পাবে। ১৯৭৪ সালের ট্রেড অ্যাক্টের সেকশন ৩০১-এর আওতায় নতুন এই শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। এই শুল্ক যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি হওয়া প্রায় ৯৯ দশমিক ৪ শতাংশ পণ্যের ওপর প্রযোজ্য হবে। তবে তেল, গ্যাস, সার ও কিছু খাদ্যপণ্যসহ কয়েকটি পণ্য এ শুল্কের বাইরে রাখা হয়েছে।
নতুন শুল্কের বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসন জানিয়েছে, নতুন শুল্কের উদ্দেশ্য কেবল বাণিজ্য ঘাটতি কমানো নয়; বরং মানবাধিকার লঙ্ঘন ও অন্যায্য বাণিজ্যিক সুবিধা রোধ করাও এর অন্যতম লক্ষ্য। কর্মকর্তাদের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রে জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের বিরুদ্ধে বিশ্বের সবচেয়ে কঠোর আমদানি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা রয়েছে। অথচ অনেক দেশ একই ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় তারা অন্যায্য প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা পাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই নতুন শুল্কারোপের পরে গতকাল শুক্রবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন বাণিজ্যিক শুল্ক ব্যবস্থায় বাংলাদেশ সর্বনিম্ন ১০ শতাংশ শুল্কহার পেয়েছে। এর ফলে চীন, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডসহ প্রধান পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর তুলনায় মার্কিন বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা আরও শক্তিশালী হবে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ১৯৭৪ সালের যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেড অ্যাক্টের ৩০১ ধারার আওতায় জোরপূর্বক শ্রম ব্যবহারের অভিযোগে তদন্ত শেষে মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির কার্যালয় (ইউএসটিআর) বিশ্বের ৮৬টি দেশের প্রতিনিধিত্বকারী ৬০টি অর্থনীতির জন্য নতুন শুল্কহার ঘোষণা করেছে। ২৩ জুলাই ঘোষিত এ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১০ থেকে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত নতুন শুল্ক কার্যকর হয়েছে। এর মাধ্যমে ট্রেড অ্যাক্টের ১২২ ধারার আওতায় পূর্বে আরোপিত অস্থায়ী ১০ শতাংশ বৈশ্বিক শুল্কের পরিবর্তে নতুন ব্যবস্থা কার্যকর হলো।
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে আমদানিকৃত পণ্যের ওপর বিদ্যমান মোস্ট ফেভার্ড নেশন (এমএফএন) শুল্কের পাশাপাশি অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, ৮৬টি দেশের মধ্যে মাত্র ১৭টি দেশ সর্বনিম্ন ১০ শতাংশ শুল্কস্তরে স্থান পেয়েছে। বাংলাদেশও এ তালিকায় থাকায় যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি পোশাকসহ সামগ্রিক রপ্তানি বাজারে দেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান অক্ষুণ্ন থাকবে। অন্যদিকে, বাংলাদেশের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী পোশাক রপ্তানিকারক দেশ চীন, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডকে সর্বোচ্চ ১২ দশমিক ৫ শতাংশ শুল্কস্তরে রাখা হয়েছে। ফলে এসব দেশের তুলনায় মার্কিন বাজারে বাংলাদেশের তুলনামূলক সুবিধা আরও বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে।
এ ছাড়াও ইউএসটিআর বাংলাদেশ, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার জন্য তিন বছর মেয়াদি ট্যারিফে-রেট কোটা (টিআরকিউ) চালুর বিষয়টি বিবেচনা করছে। এ ব্যবস্থা কার্যকর হলে যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ও বস্ত্র উপকরণ ব্যবহার করে উৎপাদিত পণ্যের ক্ষেত্রে ৩০১ ধারার অতিরিক্ত শুল্ক মওকুফ করা হতে পারে। এটি বাস্তবায়িত হলে, বাংলাদেশ আরও প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা পাবেন এবং মার্কিন বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানিকে উৎসাহিত করবে।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, বাংলাদেশ সরকার আন্তর্জাতিক শ্রমমান সমুন্নত রাখতে সম্পূর্ণরূপে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আন্তর্জাতিক শ্রমমান বজায় রাখা এবং দেশের গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি খাতগুলোর টেকসই প্রবৃদ্ধি, নীতিমালা ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে বাংলাদেশ সরকার।
রপ্তানিকারকরা বলেছেন, গত ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন আদালতে পাল্টা শুল্ক স্থগিত হওয়ার পর ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইন প্রয়োগের মাধ্যমে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ হয়। সেটি শেষ হতে নতুন করে ১০ শতাংশ শুল্ক বসছে। ফলে মোট শুল্কহারে কোনো পরিবর্তন আসছে না। তবে দুশ্চিন্তা হচ্ছে, ট্রাম্প প্রশাসন আরেকটি বিষয়ে তদন্ত করছে। সেখানে কোনো শুল্ক আরোপ হয় কি না, সেটির জন্য অপেক্ষায় থাকতে হবে।
ইউএসটিআর গত ১২ মার্চ পণ্য উৎপাদনে জোরপূর্বক শ্রম বন্ধে বাংলাদেশসহ ৬০টি দেশ যথেষ্ট পদক্ষেপ নিয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে দেশগুলোর বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে। তার আগে উৎপাদন খাতে অতিরিক্ত সক্ষমতা ও অতিরিক্ত উৎপাদন করা হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে বাংলাদেশসহ বিশ্বের ১৬টি দেশের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে সংস্থাটি। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে মূলত তৈরি পোশাক ও সিমেন্ট খাতের অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে কি না, সেটি তদন্ত হচ্ছে। ইতোমধ্যে শুনানিও শেষ। শিগগিরই এই তদন্তের প্রতিবেদন প্রকাশ করতে পারে ইউএসটিআর।
এর আগে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০২৫ সালের ২ এপ্রিল বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে পণ্য আমদানির ওপর বিভিন্ন হারে পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন। শুরুতে বাংলাদেশের জন্য এই হার ছিল ৩৭ শতাংশ। পরে শুল্ক আরোপ তিন মাসের জন্য পিছিয়ে দেয় যুক্তরাষ্ট্র। গত বছরের ৭ জুলাই বাংলাদেশের ওপর আরোপিত শুল্ক ৩৭ থেকে ৩৫ শতাংশে নামানোর ঘোষণা দেন ট্রাম্প। আরও দরকষাকষির পর ২ আগস্ট এই হার কমে হয় ২০ শতাংশ। গত বছরের ৭ আগস্ট থেকে এই পাল্টা শুল্কহার কার্যকর হয়। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানিতে গড় শুল্ক ১৫ শতাংশ। পাল্টা শুল্ক এই শুল্কের অতিরিক্ত হিসেবে আরোপ হয়।
গত ৯ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশ পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তি করে। সে চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশের ওপর দেশটির পাল্টা শুল্কের হার ১৯ শতাংশ। দুই সপ্তাহ পার না হতেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের ওপর যে পাল্টা শুল্ক আরোপ করেছিলেন, তা মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট অবৈধ ঘোষণা করেন। সেই রায়ের কয়েক ঘণ্টার মাথায় সব দেশের পণ্যের ওপর ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইন প্রয়োগের মাধ্যমে নতুন করে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন ট্রাম্প।
