ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার জেরে চলা মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘ হলে বাংলাদেশিদের শ্রমবাজার সংকুচিত হওয়ার সঙ্গে বাড়তে পারে বেকারত্ব। এর অভিঘাত রিজার্ভ ছাড়িয়ে পড়বে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে।
নিরাপদ ভবিষ্যতের আশায় বিদেশে পাড়ি দিয়েছেন লাখো মানুষ। ছেড়ে গেছেন মা বাবা পরিবার বন্ধু স্বজন, পরিচিত সব উৎসব আর আবেগ। সঙ্গে একাকীত্বের মানসিক চাপ। কাগজের কোনো অঙ্কে তুলনাতীত নীরব এই ভাষার নাম ‘সোস্যাল কস্ট’ বা ব্যক্তির ‘সামাজিক ক্ষতি’।
দেশে ফিরলে ঋণের বোঝা আর না ফিরলে নিরাপত্তাহীনতা। এমন অবস্থায় আছে গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিলভুক্ত তেল সমৃদ্ধ ৬ দেশে অর্থাৎ সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান, কুয়েত, কাতার এবং বাহরাইনের ৪৫ লাখ প্রবাসী বাংলাদেশি।
বৈশ্বিক যুদ্ধে দেশগুলোর অর্থনীতির বিনিয়োগ স্থবির করবে, রাষ্ট্রগুলোর বিনিয়োগ বাড়বে নিস্ফল যুদ্ধে। যার অভিঘাত শুধু কোনো প্রবাসীর রুটি রুজিতে নয়, বাংলাদেশের প্রান্তিকের কোনো পরিবারকে নিঃশেষ করা থেকে রাষ্ট্রের রিজার্ভের মূল স্তম্ভ নাড়িয়ে দিতে যথেষ্ট।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. শহীদুল জাহীদ বলেন, ‘সংঘাত দীর্ঘ হলে প্রবাসীরা অর্থনৈতিক দূরাবস্থার সম্মুখীন হবেন। সন্তানদের পড়াশোনার বিঘ্ন হতে পারে। যারা প্রবাসীর আয়ের ওপর নির্ভরশীল তারা বিপাকে পড়তে পারেন। এক্ষেত্রে একটা সামাজিক অস্থিরতাও সৃষ্টি হতে পারে।
করোনার সময়ের অভিজ্ঞতা বলছে, বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির এই দ্বন্দ্ব বৈশ্বিক বাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। যা আবারও উসকে দিতে পারে বেকারত্বের সংখ্যা। আঘাত সবচেয়ে বেশি আসবে দেশগুলোর তৃতীয় শ্রেণীর কর্মজীবী শ্রমিক ও প্রবাসী শ্রম আয় নির্ভর দেশগুলোর ওপর। ফলে ব্যাকরণের বাইরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ হতে যাচ্ছে ভূ-রাজনীতি।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, মোট প্রবাসী আয় প্রায় ৪৫.৪০ শতাংশ এসেছে জিসিসিভুক্ত মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের কারণে প্রবাসীরা চাকরি হারা হয়ে গেলে কিংবা দেশে ফিরতে বাধ্য হলে দুটি নেতিবাচক পরিবেশ সৃষ্টি হতে পারে। একটি হলো- প্রবাসীরা রেমিট্যান্স পাঠাতে পারবেন না। দ্বিতীয়টি হলো- প্রবাসীরা চাকরি হারিয়ে যখন দেশে ফেরত আসবেন, তখন তাদের জন্য রাষ্ট্রকে আবার অন্য-বস্ত্র-বাসস্থানের যোগান দিতে হবে। যদি যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হয় তার একটা নেতিবাচক প্রভাব আমাদের ওপর পড়বে।
গত শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) ইরানে যৌথ হামলা শুরু করে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র। হামলার প্রথম দফাতেই নিহত হন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনি। শুধু খামেনি নন, হামলায় তার পরিবারের সদস্যসহ দেশটির অন্তত অর্ধশতাধিক সিনিয়র কর্মকর্তা নিহত হন। এরপরই মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ ও সেখানে থাকা মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা শুরু করে তেহরান।
ইরানে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের অব্যাহত আগ্রাসন ও ইরানের পাল্টা হামলায় প্রতিনিয়ত বাড়ছে হতাহতের সংখ্যা। ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরানে এখন পর্যন্ত এক হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে ইরানের আক্রমণে ইসরাইলে ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ৬ সেনাও নিহত হয়েছে।
কুয়েত, বাহরাইন, আমিরাতেও হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। ইসরাইলি হামলায় লেবাননেও মারা গেছেন প্রায় অর্ধশত মানুষ। অন্তত চার থেকে পাঁচ সপ্তাহ এ সংঘাত চলতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন ট্রাম্প। আর ইরান জানিয়েছে, যুদ্ধ কবে শেষ হবে সেই সিদ্ধান্ত নেবে তেহরান।
