তাওবা ও আত্মশুদ্ধি প্রতিটি মানুষের জন্য জরুরি

মানুষ ভুল করে, পাপ করে, এটাই তার স্বভাব। কিন্তু আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতায়ালা মানুষকে কখনোই হতাশ হতে দেননি। তিনি কোরআনে ঘোষণা করেছেন, “হে আমার বান্দারা, যারা নিজেদের ওপর সীমালঙ্ঘন করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব গুনাহ মাফ করে দেন। তিনিই ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (সুরা জুমার : ৫৩)।

প্রত্যেক মানুষ ভুল করে, আর যারা ভুলকারীদের মধ্যে সর্বোত্তম, তারা হলো যারা তাওবা করে।”
প্রত্যেক মানুষ ভুল করে, আর যারা ভুলকারীদের মধ্যে সর্বোত্তম, তারা হলো যারা তাওবা করে।”

তাওবার গুরুত্ব

রসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,

প্রত্যেক মানুষ ভুল করে, আর যারা ভুলকারীদের মধ্যে সর্বোত্তম, তারা হলো যারা তাওবা করে। (তিরমিজি, হাদিস : ২৪৯৯)। তাওবা শুধু গুনাহ মাফের পথ নয়, বরং হৃদয়কে কলুষমুক্ত করার উপায়। যে বান্দা তাওবা করে, আল্লাহ তাকে এত ভালোবাসেন যে, মরুভূমিতে পথহারা এক ভ্রমণকারী যখন হঠাৎ তার হারানো উট ও পানি ফিরে পায়, তখন যে আনন্দ অনুভব করে-আল্লাহর আনন্দ তার চেয়েও বেশি। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৭৪৪)।

তাওবার শর্ত

আলেমরা তাওবার চারটি মৌলিক শর্ত বর্ণনা করেছেন,

১. গুনাহ ত্যাগ করা – সাথে সাথে পাপ থেকে বিরত থাকা।
২. অনুশোচনা – অন্তরে গভীরভাবে দুঃখ ও আফসোস করা।
৩. সঙ্কল্প -আর কখনো সেই গুনাহ করবে না বলে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করা।
৪. হক আদায় – যদি মানুষের হক নষ্ট করা হয়, তবে তা ফিরিয়ে দেওয়া বা ক্ষমা চেয়ে নেওয়া।

এ ছাড়া তাওবা বিলম্ব না করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে, কারণ মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে করা তাওবা কবুল হয় না। আল্লাহ বলেন, যখন মৃত্যুযন্ত্রণায় পড়ে যায়, তখন আর তাওবা কবুল করা হয় না। (সুরা নিসা : ১৮)।

আত্মশুদ্ধি ও নফস নিয়ন্ত্রণ

আল্লাহ কোরআনে বলেছেন,

যে নিজেকে পরিশুদ্ধ করেছে, সে সফলকাম হয়েছে। আর যে নিজেকে কলুষিত করেছে, সে ধ্বংস হয়েছে। (সুরা শামস : ৯-১০)।

মানুষের নফস বা প্রবৃত্তি তাকে পাপের দিকে টেনে নিয়ে যায়। আত্মশুদ্ধি মানে হলো সেই নফসকে নিয়ন্ত্রণ করা, পাপ থেকে দূরে থাকা এবং আল্লাহর আদেশ মেনে চলা।

রসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, শক্তিশালী সে ব্যক্তি নয়, যে কুস্তিতে জয়ী হয়; বরং প্রকৃত শক্তিশালী সে, যে রাগের সময় নিজের নফসকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। (বুখারি ও মুসলিম)।

তাওবা ও সমাজ পরিবর্তন

তাওবা শুধু ব্যক্তিগত নয়, বরং সামাজিক পরিবর্তনেরও মাধ্যম। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়-যখন মানুষ তাওবা করে, আল্লাহ তাদের জন্য রহমতের দরজা খুলে দেন। কোরআনে হযরত নুহ (আ.)-এর বাণী বর্ণিত আছে,

তোমরা তোমাদের প্রভুর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো, নিশ্চয়ই তিনি ক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের ওপর আকাশ থেকে প্রাচুর্যে বৃষ্টি পাঠাবেন এবং তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান বৃদ্ধি করবেন। (সুরা নুহ : ১০-১২)।

অতএব, তাওবা কেবল গুনাহ মাফের পথ নয়, বরং জীবনে বরকত, শান্তি ও উন্নতির দরজাও।

বর্তমান প্রেক্ষাপট

আজকের যুগে মানুষ ভোগবিলাস, বস্তুবাদ আর পাপাচারে নিমগ্ন। মাদকাসক্তি, সুদ, জুয়া, পর্নোগ্রাফি, পরিবার ভাঙন, দুর্নীতি-এসব সমাজকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দিচ্ছে। এর একমাত্র প্রতিষেধক হলো-আল্লাহর কাছে আন্তরিক তাওবা এবং আত্মশুদ্ধি।

রসুলুল্লাহ (সা.) নিজেও প্রতিদিন ৭০ বারের বেশি আল্লাহর কাছে ইস্তিগফার করতেন। (বুখারি, হাদিস : ৬৩০৭)। তাহলে আমরা কত বেশি প্রয়োজন বোধ করি!

করণীয়
১. প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় ইস্তিগফার করা।
২. প্রতিটি গুনাহের পরই সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহর কাছে ফিরে আসা।
৩. ভালো কাজ বাড়ানো-কারণ সৎকর্ম গুনাহ মুছে দেয়। (সুরা হুদ : ১১৪)।
৪. আল্লাহর স্মরণে (যিকির, নামাজ, কোরআন পাঠ) সময় ব্যয় করা।
৫. আত্মশুদ্ধির জন্য সৎ সাহচর্য গ্রহণ ও আলেমদের সঙ্গ নেওয়া।

তাওবা মানুষের আত্মাকে বিশুদ্ধ করে, অন্তরে শান্তি আনে এবং আল্লাহর রহমত অর্জনের পথ খুলে দেয়। যে জাতি আল্লাহর দিকে ফিরে আসে, সেই জাতি ধ্বংস হয় না। তাই আসুন, আমরা সবাই আন্তরিক তাওবা করি, নিজেদের নফসকে পরিশুদ্ধ করি এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে ফিরে আসি।

Read Previous

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান পাল্টাপাল্টি হামলায় যে বার্তা দিলো চীন

Read Next

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলার জন্য বিশেষ হাইকোর্ট বেঞ্চ গঠন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular