তারল্যের প্রাচুর্যেও বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহে ভাটা কেন?

দেশের ব্যাংক খাতে বর্তমানে ৩ লাখ ৭৭ হাজার কোটি টাকার বেশি তারল্য রয়েছে। এর মধ্যেই অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে ২৫ হাজার কোটি টাকার একটি নতুন স্কিম ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির মতে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত না হলে বেসরকারি খাত ঋণ নিতে খুব একটা আগ্রহ দেখাবে না।

অন্যদিকে বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা দূর না হলে কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বিনিয়োগ, শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, এসএমই খাতের বিকাশ, রফতানি আয় এবং ভোগব্যয়ের সক্ষমতা অনেকাংশেই বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভরশীল।

বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির হার পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এটি ছিল গড়ে ১১ দশমিক ৩২ শতাংশ। কোভিড-পরবর্তী সময়ে দুই বছর প্রবৃদ্ধি কমে এলেও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের প্রভাবে ২০২১ সালে ঋণ প্রবৃদ্ধি সর্বোচ্চ ১৩ দশমিক ২৫ শতাংশে পৌঁছায়।

তবে ২০২৪ সাল থেকে আবারও ঋণ প্রবৃদ্ধি কমতে শুরু করে। ২০১৯ থেকে ২০২৫ অর্থবছর পর্যন্ত গড় ঋণ প্রবৃদ্ধি দাঁড়ায় ৯ দশমিক ৮৪ শতাংশ। বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতি, কঠোর মুদ্রানীতি, জ্বালানি খাতের অস্থিরতা, দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ এবং খেলাপি ঋণের চাপের কারণে বেসরকারি খাত বিনিয়োগে পিছিয়ে গেছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। এরই প্রভাব পড়ে শিল্প খাতে। ২০২৬ সালের এপ্রিলে শিল্প খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে, যার ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হন লাখ লাখ শ্রমিক-কর্মচারী। এ পরিস্থিতিতে বিনিয়োগ বাড়াতে এবং অর্থনীতিতে নতুন গতি আনতে ২৫ হাজার কোটি টাকার স্কিম চালু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

তবে শুধু অর্থের জোগান দিলেই কাঙ্ক্ষিত ফল মিলবে না বলে মনে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যানশিয়াল স্ট্যাবিলিটি ডিপার্টমেন্টের পরিচালক মো. শাহরিয়ার সিদ্দিকী বলেন, ঋণ নেয়ার ক্ষেত্রে উদ্যোক্তারা কিছুটা নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। এর অন্যতম কারণ অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, বিশেষ করে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট। পাশাপাশি জ্বালানির মূল্যও বেড়েছে। সব মিলিয়ে বেসরকারি খাত বিনিয়োগে উৎসাহ পাচ্ছে না। সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হলো উপযুক্ত বিনিয়োগ পরিবেশ তৈরি করা। শুধু ব্যাংক খাতে তারল্য বাড়ালেই কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না।

অবকাঠামো ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত না হলে কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সরকারের ইশতেহার বাধাগ্রস্থ হবে বলে শঙ্কা অর্থনীতিবিদদেরও। সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, অর্থনীতির প্রধান প্রতিবন্ধকতা এখন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট। এসব সমস্যা সমাধান না করে শুধু ঋণ সুবিধা দেয়া হলে দুই ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। একদিকে উদ্যোক্তারা ঋণ নিতে আগ্রহী নাও হতে পারেন, অন্যদিকে ঋণ নিলেও ব্যবসা সচল রাখতে না পারলে তা ভবিষ্যতে খেলাপি ঋণে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা থাকবে।

এদিকে অর্থ মন্ত্রণালয় ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়, গত ১৭ বছরে দেশের জ্বালানি খাত আমদানিনির্ভরই রয়ে গেছে। তবে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে গেলেও বিকল্প পথ ব্যবহার করে জ্বালানি আমদানির প্রস্তুতি রয়েছে। একই সঙ্গে জ্বালানিতে স্বনির্ভরতা বাড়াতে বাপেক্সকে আরও শক্তিশালী করা এবং দেশের অভ্যন্তরে নতুন জ্বালানি উৎস অনুসন্ধানে বিদেশি সহযোগিতা নেয়ার উদ্যোগও চলছে।

Read Previous

চার গোলে এগিয়ে জাপান

Read Next

বিশ্ব বাবা দিবস আজ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular