রংপুরের বিতর্কিত হজ ও ট্রাভেল ব্যবসায়ী খোরশেদুর রহমান প্রিন্সকে গ্রেফতারের জন্য রাজধানীর অফিসে তল্লাশি চালিয়েছে পুলিশ।
শনিবার (২৫ জুলাই) বিকেলে পুরানা পল্টনের ফায়েনাজ টাওয়ারের ১৪ তলায় প্রিন্সের মালিকানাধীন সাবওয়ে ট্যুরস এন্ড ট্রাভেলস অফিসে অভিযান চালায় পল্টন থানা পুলিশ। ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি প্রিন্স পুলিশ অভিযানের সংবাদ পেয়েই পালিয়ে যান। তবে পুলিশ জানিয়েছে, চেক প্রতারণা মামলায় ওয়ারেন্ট থাকায় প্রিন্সকে গ্রেফতারে অভিযান চালানো হয়েছে।
২০২৫ সালের ১৮ মে রংপুরে দায়ের হওয়া বৈষম্যবিরোধী মামলায় এজাহারভুক্ত আসামি প্রিন্স। রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কোতয়ালী থানায় দায়ের হওয়া মামলার এজাহারে প্রিন্সকে আওয়ামী লীগের অর্থের জোগানদাতা হিসেবে উল্লেখ রয়েছে। অন্যদিকে ঢাকার এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে নেয়া ৫০ লাখ টাকা চেক জালিয়াতির মামলায় খোরশেদুর রহমান প্রিন্সের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা রয়েছে।
রংপুরে আবাসন, প্লট বিক্রিসহ নানা ব্যবসায় জড়িয়ে বিপুল অর্থের মালিক হয়েছেন তিনি। মাত্র ৫ লাখ টাকা বিনিয়োগে কোটিপতি হওয়ার সুযোগ- চটকদার এমন বিজ্ঞাপন দিয়ে রংপুরের দেওডোবায় মডার্ন সিটি নামে প্লট বিক্রি করছেন প্রিন্স। রংপুরে প্রভাব খাঁটিয়ে মানুষের কাছ থেকে কমদামে জমি কিনেও টাকা না দেয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
অভিযান সম্পর্কে জানতে চাইলে পল্টন থানার উপ পরিদর্শক মো: নূরুজ্জামান জানান, ওয়ারেন্টভুক্ত আসামিদের গ্রেফতারে ডিএমপির সপ্তাহব্যাপী বিশেষ অভিযান চলমান রয়েছেন। তারই ধারাবাহিকতায় ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি প্রিন্সের তথ্য জানতে পুলিশের পক্ষ থেকে অভিযান পরিচালনা করা হয়। প্রিন্স অফিসে না থাকায় কর্মচারীদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।
চার বছর আগে প্রিন্স রংপুর জজকোর্টের পাশে ত্রিশ শতক জায়গা বায়না করে বহুতল ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেন। হাজী গ্র্যান্ড প্রোপারর্টিজ নামে বহুতল ভবনে বিনিয়োগে দ্বিগুণ মুনাফার ফাঁদে হাজীদের কাছ থেকে নিয়েছে প্রায় ১৮ কোটি টাকা। কিন্তু দুই বছর পেরিয়ে গেলেও ভবন নির্মাণ শুরু হয়নি। বিনিয়োগকারীরা খোঁজ নিয়ে জেনেছেন, প্রতারক প্রিন্স বিনিয়োগের টাকা অন্যত্র সরিয়ে নিয়েছেন। টাকা ফেরত চাইলে তিনি টালবাহানা শুরু করেন। উল্টো মামলা দিয়ে পাওনাদারদের হয়রানি করাচ্ছেন বলে অভিযোগ এসেছে। ভুক্তভোগীদের একজন মো. হোসেন, তিনি জানান চুক্তিপত্রের মাধ্যমে তিনি ৫০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে প্রতারিত হয়েছেন। পাওনা টাকা চাইলে উল্টো মামলা দিয়ে হয়রানি করাচ্ছেন প্রিন্স। রংপুরের বিনোদপুরের মোহাম্মদ আবুল ফাত্তাহ সরকারের জমি কেনার পর এখনো পাওনা ১৭ লাখ টাকা দেয়নি প্রিন্স।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রিন্স রংপুর বাস টার্মিনালে আদর্শ ফার্মেসি দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে ওষুধ কোম্পানির রংপুর মেডিকেল কলেজ বিক্রয় প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেছেন। ২০১৮ সাল থেকে তিনি সাবওয়ের ট্রাভেলস লাইসেন্স কিনে হজ ওমরাহ এবং এয়ার টিকিটের লাইসেন্স নিয়ে ব্যবসা শুরু করেন। রংপুর শহরে যেসকল জমির মালিকানায় ঝামেলা আছে এমন জমি কেনাবেচা করে আর্থিকভাবে লাভবান হন। এই অনৈতিক কাজে তাকে পুরোপুরিভাবে সহায়তা করেছেন তার বাল্যবন্ধু ও গোপন ব্যবসায়িক অংশীদার প্রভাবশালী এক বিচারক। এই অনৈতিক কাজের পুরস্কার হিসেবে রংপুর বাস টার্মিনালের পাশে প্রিন্সের তত্ত্বাবধায়নে নির্মিত ভবনে একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট বাল্যবন্ধুকে উপহার দিয়েছেন তিনি।
তার সহধর্মিনী শামীমা দিলরুবা রায়হান লিমি রংপুর সদর উপজেলার নুরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মরত। তিনি সরকারি চাকরি করেন রংপুরে। কিন্তু ঢাকার উত্তরায় রাজউকের ফ্ল্যাট কিনেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। একটি বেসরকারি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান হিসেবে আয় করছেন বিপুল অর্থ। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকতার আড়ালে বহুমুখী ব্যবসা, আবাসন কোম্পানি পরিচালনা এবং জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ ১২ কোটি টাকা অর্জনের অভিযোগ উঠেছে লিমির বিরুদ্ধে। অবৈধ সম্পদ নিয়ে তদন্ত করছে জেলা প্রশাসন।
তারপরও গত ২৭ জুন রংপুর মডেল মসজিদে প্রকাশ্যে অনুষ্ঠান করেছেন হজ ব্যবসায়ী খোরশেদুর রহমান প্রিন্স। বিষয়টি কোতয়ালী থানা পুলিশের নজরে আসার পর প্রিন্স গা ঢাকা দেন। অভিযোগের বিষয়ে জানতে বারবার ফোন দেয়া হলেও প্রিন্স কোন মন্তব্য করেননি। লালমনিরহাট জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক প্রিন্স বিগত সরকারের সময় দাপুটে ব্যবসায়ী ছিলেন।
জাতীয় পার্টির সাথে ম্যানেজ করেই চলেছেন। ক্ষমতার পালাবদলের পর তিনি এখন বিএনপি নেতাদের ম্যানেজ করে প্রতারণার চেষ্টা করছেন। ইতোমধ্যে রংপুরে শক্তিশালী নেটওয়ার্ক তৈরি করেছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
