আল্লাহর নবীগণের দৃঢ় তাওয়াক্কুল

সুরা ফাতিহায় আল্লাহ তাআলা আমাদের বলতে শিখিয়েছেন, ‘আমরা একমাত্র আপনারই ইবাদত করি এবং একমাত্র আপনারই সাহায্য প্রার্থনা করি।’ তাওয়াক্কুল এক আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়ারই চূড়ান্ত রূপ। আমরা যদি আল্লাহ তাআলার ইবাদতের পাশপাশি ‘একমাত্র আল্লাহ তাআলার কাছে সাহায্য চাওয়া’কে পূর্ণতা দিতে পারি, সেটাই হলো তাওয়াক্কুলের সারমর্ম। এ আয়াত থেকে বোঝা যায়, মহান আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল বা ভরসা রাখা হলো আমাদের সমস্ত আমলের অর্ধাংশ।

আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনের একাধিক আয়াতে তাওয়াক্কুলকে ইমানের সাথেও সংযুক্ত করেছেন। হজরত মুসা (আ.) তাঁর সম্প্রদায়কে বলেছিলেন, যদি তোমরা আল্লাহর ওপর ইমান এনে থাকো, তবে তাঁর ওপরই তাওয়াক্কুল করো। অন্য আয়াতে এসেছে, তোমরা যদি মুসলিম হয়ে থাকো, তবে আল্লাহর ওপরই তাওয়াক্কুল করো। আবার অন্য জায়গায় আল্লাহ বলেছেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর ওপর তাওয়াক্কুলকারীদের ভালোবাসেন।

আপনি যদি সকল নবী-রাসুলদের জীবনীর দিকে তাকান, তবে দেখতে পাবেন তাঁদের মধ্যে আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল কত সুদৃঢ় ছিল। যখন হজরত ইবরাহিমকে (আ.) নমরুদের তৈরি করা অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করা হচ্ছিল, তখন তিনি বলেছিলেন, ‘হাসবুনাল্লাহু ওয়া নি’মাল ওয়াকিল’ অর্থাৎ আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট এবং তিনিই উত্তম অভিভাবক। আর আল্লাহ তাআলা সেই আগুনকে ঠান্ডা ও শান্তিদায়ক বানিয়ে দিয়েছিলেন।

যখন হজরত মুসা (আ.) একপাশে ফেরাউনের সেনাবাহিনী এবং অন্যপাশে লোহিত সাগরের মাঝে আটকা পড়ে গিয়েছিলেন, তখন বনি ইসরাইল বা মুসার (আ.) সঙ্গী-সাথীরা আকুল হয়ে বলে উঠেছিল, আমরা তো ধ্বংস হয়ে গেলাম! কিন্তু মুসা (আ.) অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে উত্তর দিয়েছিলেন, না, এমনটা কখনোই ঘটবে না; নিশ্চয়ই আমার রব আমার সাথে আছেন, তিনি অবশ্যই আমাকে পথ দেখাবেন।

একইভাবে আমাদের প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন ছওর গুহার ভেতরে আটকা পড়েছিলেন এবং বাইরে মুশরিক শত্রুরা ঘুরে বেড়াচ্ছিল, তখন হজরত আবু বকর (রা.) শঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন যে, তারা একটু নিচু হয়ে তাকালেই আমাদের দেখে ফেলবে। তখন রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছিলেন, চিন্তিত হয়ো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন।

নিজেকে প্রশ্ন করে দেখুন, এই আত্মবিশ্বাস কোত্থেকে আসে? ইবরাহিমকে (আ.) আগুনে ছুঁড়ে ফেলা হচ্ছে, মুসা (আ.) শত্রুবাহিনী ও সাগরের মাঝখানে আটকা পড়েছেন, আবার আমাদের নবীজীর সঙ্গে কোনো সেনাবাহিনী নেই আর সামনে দাঁড়িয়ে মুশরিকরা-আল্লাহ ছাড়া আর কোনো বাহ্যিক সাহায্য পাওয়ার সুযোগ নেই। এই যে চরম মুহূর্তে অবিচল আত্মবিশ্বাস, তা কেবল তাওয়াক্কুলে পরিপূর্ণ একটি অন্তর থেকেই আসতে পারে।

তাওয়াক্কুল মানে কিন্তু নিজের সামর্থ্য বা সাধ্য অনুযায়ী চেষ্টা ছেড়ে দেওয়া নয়। তাওয়াক্কুল হলো মানুষের চিন্তা বা মানসিকতার এক বিশেষ ফ্রেম বা দৃষ্টিভঙ্গি। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে এটিকে সংক্ষেপে তুলে ধরেছেন, ‘আল্লাহ আমাদের ভাগ্যে যা লিখে রেখেছেন, তা ব্যতীত আমাদের সাথে অন্য কিছুই ঘটবে না; তিনিই আমাদের অভিভাবক।’ এটিই হলো তাওয়াক্কুল। আপনার অন্তর, আপনার আত্মাকে আল্লাহর সাথে জুড়ে দিতে হবে, আর আপনার শরীর বাহ্যিক শারীরিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবে। কিন্তু আপনার অন্তর কখনোই কেবল চেষ্টার ওপর আটকে থাকবে না।

যেমন আপনি যদি অসুস্থ হন, তবে আপনি ডাক্তারের কাছে যাবেন, থেরাপি নেবেন, ওষুধ খাবেন বা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা করাবেন—সবকিছুই করবেন। কিন্তু আপনার অন্তর থেরাপি বা ডাক্তারের ওপর নির্ভরশীল হবে না, আপনার অন্তর আটকে থাকবে আল্লাহর সাথে।

আপনি একটি খামার গড়ে তুলতে চাইলে জমি কিনবেন, হাল চাষ করবেন, বীজ রোপণ করবেন, সেচ দেবেন; কিন্তু আপনার তাওয়াক্কুল বা ভরসা নিজের চেষ্টার ওপর থাকবে না, থাকবে আল্লাহর ওপর।

রাসুলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সেই সুপরিচিত হাদিসটি আমরা জানি, ‘তোমার উটটি বাঁধো, তারপর আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করো।’ অর্থাৎ আপনার সাধ্যের মধ্যে থাকা সবকিছুই আপনাকে করতে হবে, তারপর আল্লাহর ওপর ভরসা করতে হবে। রাসুলুল্লাহর (সা.) জীবনের বিভিন্ন আমল থেকেও আমরা এই শিক্ষা পাই।

Read Previous

শিক্ষার্থী আন্দোলনে নীরবতা, শাহরুখকে ঘিরে প্রশ্নের ঝড়

Read Next

ছিটকেই গেলেন নাহিদ রানা, লিটন-শরিফুল কি খেলতে পারবেন?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular