জেন-জি আন্দোলনে চাপে মোদি সরকার

প্রশ্নফাঁস ইস্যুতে দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে ভারতের রাজপথ মাতিয়ে রেখেছিলেন ছাত্র জনতা। দিল্লির যন্তর মন্তরে লাঠিচার্জ হয়েছে, টিয়ারশেল ছোড়া হয়েছে, ইন্টারনেট বন্ধ হয়েছে। তবুও থামেনি শিক্ষার্থীদের স্লোগান। শেষ পর্যন্ত যে সিদ্ধান্ত নিতে নরেন্দ্র মোদিকে বাধ্য হতে হলো, তা তার ১২ বছরের শাসনামলে বিরল। পদত্যাগ করলেন শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। কিন্তু এটি কি শুধুই একজন মন্ত্রীর বিদায়? নাকি ভারতের রাজনীতিতে শুরু হলো নতুন এক বাস্তবতা-যেখানে সংঘবদ্ধ তরুণদের চাপের সামনে প্রথমবারের মতো নতি স্বীকার করল মোদি সরকার? প্রশ্নফাঁসের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া আন্দোলন কি এখন তরুণদের রাজনৈতিক আত্মবিশ্বাসের নতুন অধ্যায়?

মোদির নতি স্বীকার

ভারতের রাজনীতিতে নরেন্দ্র মোদির একটি পরিচিত বৈশিষ্ট্য হলো- চাপের মুখেও খুব সহজে পিছু না হটা। কৃষক আন্দোলনের সময় দীর্ঘ এক বছর অপেক্ষা করেছিলেন। সিএএ-এনআরসি নিয়েও দীর্ঘদিন নিজের অবস্থান বদলাননি। কিন্তু এবারের চিত্রটা ভিন্ন। নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে শুরু হওয়া শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ধীরে ধীরে শুধু একটি পরীক্ষার ইস্যুতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। এটি পরিণত হয়েছিল শিক্ষাব্যবস্থার জবাবদিহিতা, বেকারত্ব, দুর্নীতি এবং তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশে। প্রথমে বিষয়টিকে গুরুত্ব না দিলেও আন্দোলনের ব্যাপ্তি বাড়তে থাকে। রাজধানী দিল্লি ছাড়িয়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন রাজ্যে। অবশেষে রাজনৈতিক চাপ এতটাই বাড়ে যে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেন। এটি শুধু একজন মন্ত্রীর বিদায় নয়; এটি এমন একটি ঘটনা, যা দেখিয়ে দিল- সংগঠিত ছাত্র আন্দোলনের চাপ সরকারকেও সিদ্ধান্ত বদলাতে বাধ্য করতে পারে।

তেলাপোকা আন্দোলনের সবচেয়ে বড় অর্জন

এই আন্দোলনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, তরুণদের ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম ‘ককরোচ জনতা পার্টি’বা সিজেপির উত্থান। প্রশ্নফাঁসের প্রতিবাদকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই প্ল্যাটফর্ম খুব অল্প সময়েই বিভিন্ন ভাষা, রাজ্য ও সম্প্রদায়ের শিক্ষার্থীদের একই দাবিতে একত্র করতে সক্ষম হয়। তাদের প্রথম ও প্রধান দাবি ছিল শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ। পদত্যাগের পর সিজেপি আরও দুটি শর্ত সামনে আনে-আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে করা মামলা প্রত্যাহার এবং প্রশ্নফাঁস-পরবর্তী আত্মহত্যা করা শিক্ষার্থীদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ।

সরকার আলোচনায় বসে এসব দাবির বিষয়ে আশ্বাস দেয়ার পর আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষণা আসে। অর্থাৎ, সংঘাতের বদলে আলোচনার মাধ্যমে আপাতত সংকটের অবসান ঘটলেও, আন্দোলনকারীরা নিজেদের বিজয় হিসেবেই এই ফলাফল তুলে ধরছেন।

মোদির জন্য কেন এটি রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ?

ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে আন্দোলনের মুখে কোনো কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর পদত্যাগ খুবই বিরল ঘটনা। আর সেই কারণেই ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগকে অনেক বিশ্লেষক কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন না। কারণ এর মাধ্যমে একটি নতুন বার্তা সামনে এসেছে।

সরকারকে সংগঠিত গণচাপের মুখে ছাড় দিতে বাধ্য করা সম্ভব

এই বার্তাই ভবিষ্যতের জন্য সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। যদি ভবিষ্যতে অন্য কোনো ইস্যুতে একই ধরনের ছাত্র ঐক্য গড়ে ওঠে, তাহলে সরকারের ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে। তবে একই সঙ্গে এটাও সত্য, সরকার দ্রুত নতুন শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে বিজেপির জ্যেষ্ঠ নেতা প্রলহাদ জোশীকে দায়িত্ব দিয়ে প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখার চেষ্টা করেছে। অর্থাৎ, সরকারও চাইছে সংকট দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনতে।

নতুন শিক্ষামন্ত্রীর সামনে পরীক্ষা

ধর্মেন্দ্র প্রধানের স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন বিজেপির জ্যেষ্ঠ নেতা প্রলহাদ জোশী। তার সামনে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব-
• নিট পরীক্ষা নিয়ে শিক্ষার্থীদের হারিয়ে যাওয়া আস্থা ফিরিয়ে আনা
• জাতীয় পরীক্ষা পরিচালনাকারী সংস্থা এনটিএ-র সংস্কার
• প্রশ্নপত্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করা
• ভবিষ্যতে এমন সংকট আর না ঘটে, সেই ব্যবস্থা নেওয়া

কারণ শুধু মন্ত্রী বদল করলেই সংকটের সমাধান হবে না। যদি পরীক্ষাব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা ফিরিয়ে আনা না যায়, তাহলে একই ইস্যু আবারও রাজনৈতিক সংকটে পরিণত হতে পারে।

একজন মন্ত্রীর পদত্যাগে হয়তো আপাতত থেমেছে আন্দোলন। কিন্তু যে প্রশ্নগুলো লাখো তরুণকে রাজপথে নামিয়েছিল, সেগুলোর কোনোটিই এখনো পুরোপুরি মুছে যায়নি। প্রশ্নপত্র ফাঁস, শিক্ষাব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা, বেকারত্ব, আর ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা- এই সংকটগুলোর সমাধান না হলে ক্ষোভ আবারও ফিরে আসতে পারে। ধর্মেন্দ্র প্রধানকে সরিয়ে মোদি সরকার হয়তো তাৎক্ষণিক চাপ সামলেছে। এখন দেখার বিষয়, সরকার কি শুধু মুখ বদলেই থেমে যায়, নাকি বদলে ফেলে পুরো ব্যবস্থাকেও। কারণ ইতিহাস বলছে আন্দোলন থেমে যেতে পারে, কিন্তু আন্দোলনের কারণ বেঁচে থাকলে রাজপথ আবারও জেগে উঠতে সময় লাগে না।

Read Previous

এনসিটিবিতে ২ হাজার ৭১১ কোটি টাকার অনিয়ম, যা বলছেন গবেষকরা

Read Next

রক্তাক্ত ২৮ জুলাই: নাহিদ ইসলামের বক্তব্য ঘিরে সন্দেহ-সমালোচনার ঝড়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular