প্রাথমিক শিক্ষা পদক ২০২৬-এর ঢাকা বিভাগীয় নৃত্য প্রতিযোগিতার বিচারকাজ নিয়ে ব্যাপক অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে। ঢাকা বিভাগের ১৩টি জেলার শ্রেষ্ঠ ২৬ জন প্রতিযোগীকে পেছনে ফেলে ছেলে ও মেয়ে-উভয় ক্যাটাগরিতেই প্রথম স্থান অর্জন করেছে গোপালগঞ্জের একটি নির্দিষ্ট ড্যান্স একাডেমির দুই শিশু। প্রতিযোগিতায় বিশেষজ্ঞ বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা হাসনা ফিতরিয়া বানু কাকলির বিরুদ্ধে এই পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ এনেছেন ক্ষুব্ধ অভিভাবকেরা।
ভুক্তভোগী একাধিক অভিভাবকের অভিযোগ, গোপালগঞ্জের ‘ঘুঙুর ড্যান্স একাডেমি’র প্রশিক্ষক সম্রাট হাজরা এবং বিচারক হাসনা ফিতরিয়া বানু কাকলী দীর্ঘদিন ধরে শিল্পকলা একাডেমি ও শিশু একাডেমির বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিযোগিতায় একসঙ্গে বিচারক হিসেবে কাজ করছেন। তাদের এই দীর্ঘদিনের সখ্যতা ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার কারণেই বাকি ১২টি জেলার প্রতিযোগীদের বঞ্চিত করে গোপালগঞ্জের ওই একাডেমির দুই শিক্ষার্থীকে প্রথম করা হয়েছে।
প্রতিযোগিতায় ছেলেদের বিভাগে দ্বিতীয় স্থান পাওয়া আল আমিন হাসান জিদানের মা পারভীন হাসান এই বিষয়ে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। জিদান নারায়ণগঞ্জের আমলাপাড়া আই.ই.টি বালক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র এবং বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) একজন নিয়মিত তালিকাভুক্ত শিশুশিল্পী। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ডিসি সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জিদানের নৃত্য পরিবেশনা দেখে তার ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন।
অভিযোগকারী পারভীন হাসান বলেন, ”বিচারক কাকলি পরিচালিত নিজস্ব ড্যান্স একাডেমিতে জিদান নাচ না শেখার কারণে তাকে বারবার উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বাদ দেওয়া হচ্ছে। কাকলি ও সম্রাট হাজরা সিন্ডিকেট করে গত দুই বছর ধরে জিদানকে অন্যায়ভাবে দ্বিতীয় বানিয়ে রাখছেন। তিনি মূলত তার নিজস্ব একাডেমি অথবা পছন্দের প্রশিক্ষকদের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা নিয়ে এই বিচারকাজ পরিচালনা করেন।”
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী এই প্রতিযোগিতায় মোট তিনজন বিচারক দায়িত্ব পালন করেন। এর মধ্যে দুজন থাকেন থানা শিক্ষা অফিসার এবং একজন থাকেন পেশাদার নৃত্যশিল্পী (বিশেষজ্ঞ বিচারক)। অভিযোগ রয়েছে, শিল্পকলা একাডেমির সাবেক বিতর্কিত মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকীর বিশেষ সুপারিশে হাসনা ফিতরিয়া বানু কাকলি গত ৫ বছর ধরে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অধীনে রাষ্ট্রীয় প্রতিযোগিতায় বিচারকের আসন দখল করে আছেন। গত বছরের ৫ আগস্ট দেশে পটপরিবর্তন হলেও কাকলি কৌশলে এখনো বিচারক হিসেবে নিজের প্রভাব বজায় রেখেছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহীন ফেরদৌসি বলেন, ”প্রতিযোগিতাটি সরকারি নীতিমালার আলোকেই অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে নৃত্য বিচারক কাকলীর বিষয়ে এর আগেও আমাদের কাছে কিছু মৌখিক অভিযোগ এসেছে। জিদানের মায়ের লিখিত অভিযোগটি আমরা হাতে পেয়েছি এবং বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।”
নিন্দনীয় এই পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ অবশ্য সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন বিচারক হাসনা ফিতরিয়া বানু কাকলি। তার দাবি, গোপালগঞ্জের শিশুরা তাদের নিজস্ব যোগ্যতার বলেই প্রথম হয়েছে। তিনি বলেন, “আমি একা কোনো নম্বর দিইনি। আমার সাথে আরও দুজন থানা শিক্ষা অফিসার বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাই এককভাবে কাউকে প্রথম করার সুযোগ আমার নেই।”
তবে ঢাকা বিভাগের ১৩টি জেলার এতশত প্রতিভাবান শিশুদের ভিড়ে কীভাবে কেবল একজন প্রশিক্ষকের একাডেমির শিক্ষার্থীরাই দুই ক্যাটাগরিতে সেরা হলো-তা নিয়ে সাধারণ অভিভাবক ও সংশ্লিষ্টদের মনে তীব্র ক্ষোভ ও প্রশ্ন রয়েই গেছে। সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে এই প্রতিযোগিতার স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
