হৃদয়
আজ চতুর্থ দিন দ্বিতীয় ও শেষ সেশনের খেলা দেখে যে কেউ ভাবতেই পারেন, বাংলাদেশ বোলিং ব্যর্থতায় হেরেছে। কারণ, টাইগার অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তও অকপটে স্বীকার করেছেন, ‘মিরপুরের শেরেবাংলা স্টেডিয়ামের এই পিচে চতুর্থ ইনিংসে ১৭০ রান সহজ টার্গেট নয়। ক্যারিবীয়রা ভালো ব্যাটিং করেছে। কিন্তু আমরাও ভালো বোলিং করতে পারিনি। বোলিং ভালো হলে হয়তো খেলার ফল ভিন্ন হতে পারত।’
বাংলাদেশ অধিনায়ক শান্ত কথা প্রসঙ্গে ওপরের কথাগুলো বললেও বেশিরভাগ সময় বলেছেন, ‘আমরা ভালো ব্যাটিং করিনি। দুই ইনিংসেই ব্যাটিংটা যথাযথ হয়নি।’ টাইগার ক্যাপ্টেন বিশেষ করে প্রথম ইনিংসে ৩ উইকেটে ২১৩ থেকে ২৭২ রানে অলআউট হওয়ার প্রসঙ্গ টেনে শান্ত বলেছেন, ‘ওই অবস্থায় আমাদের আরও ভালো করা উচিত ছিল। তাহলে স্কোরলাইন বড় হতো নিঃসন্দেহে।’
ব্যাটিং ব্যর্থতা নিয়ে কথা প্রসঙ্গে উঠে আসে তাওহিদ হৃদয়ের দুই ইনিংসে দায়িত্বহীন আউটের প্রসঙ্গ। ইনজুরির কারণে খেলতে না পারা মুশফিকুর রহিমের জায়গায় শেষ মুহূর্তে একাদশে ঢোকেন হৃদয়। ধারণা করা হচ্ছিল, মুশফিকুর রহিমের অভাব দূর করতে না পারলেও ‘মিস্টার ডিপেন্ডেবলের’ জায়গায় নিজের সবটুকু উজাড় করে দেবেন হৃদয়। কিন্তু বাস্তবে হয়েছে তার উল্টোটা। উভয় ইনিংসেই ভীষণ দৃষ্টিকটুভাবে আউট হয়েছেন হৃদয়।
প্রথমবার ক্যারিবীয় বাঁহাতি স্পিনার জসোয়া বিশপের উইকেটে সোজা বলে জায়গায় দাঁড়িয়ে ক্রস ব্যাটে হাঁকিয়ে বোল্ড। আর পরের ইনিংসে ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান ক্যাপ্টেন রোস্টন চেজের অফস্পিনে উইকেটে এসেই লং অনের ওপর দিয়ে তুলে মারতে যান হৃদয়। নিয়ন্ত্রণহীন শট আকাশে উঠে চলে যায় ক্যারিবীয় ফিল্ডার জায়দান সেলসের হাতে।
বাংলাদেশের ব্যাটারদের ব্যাটিং ব্যর্থতার মাঝেও হৃদয়ের পরপর দুই ইনিংসে দায়িত্বহীন শট খেলে আউট হওয়ার ঘটনাটি বাংলাদেশ ভক্তদের মনে দাগ কেটেছে। সবাই বিষয়টিকে বড় করে দেখছেন। দেখার কারণও আছে। প্রথম কারণ, হৃদয় মুশফিকুর রহিমকে রিপ্লেস করেছেন। মুশফিক হচ্ছেন টেস্টে বাংলাদেশের এক নম্বর নির্ভরতা। এখনো মুশফিক সবচেয়ে দায়িত্বশীল ব্যাটার হিসেবে সমাদৃত। দলের ব্যাটিংয়ের সমুদয় দায়দায়িত্ব নিজ কাঁধে নিয়ে ব্যাট করেন মুশফিক। মুশফিকের জায়গায় যখন হৃদয়কে নেওয়া হয়েছে, তার মানে টিম ম্যানেজমেন্টও বিশ্বাস করেছে, তার সামর্থ্য আছে সাদা বলের পাশাপাশি লাল বলে ভালো খেলার।
টিম ম্যানেজমেন্টের এমন বিশ্বাস জন্মানোর একটা কারণও আছে। মাঝে হৃদয়ের একটি সাফল্য তাকে শিরোনামে তুলে এনেছে। মাস দুয়েক আগেই দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে ক্যারিবীয় ‘এ’ দলের বিপক্ষে চার দিনের ম্যাচে বাংলাদেশ ‘এ’ দলের পক্ষে ট্রিপল সেঞ্চুরিসহ সাড়ে তিনশো করে শিরোনামে উঠে আসেন। খুব স্বাভাবিকভাবেই হৃদয়কে নিয়ে প্রত্যাশা বেড়ে যায়। সবাই ধরে নিয়েছিলেন, হৃদয় সাদা বলের পাশাপাশি লাল বলেও ভালো খেলার সামর্থ্য রাখেন। দীর্ঘ পরিসরের ক্রিকেটে তারও আছে ভালো খেলার, লম্বা ইনিংস খেলার সামর্থ্য।
কিন্তু হৃদয় চরম দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়ে সবাইকে হতাশ করেন। এর মধ্যে প্রথম ইনিংসে শুরু থেকে আত্মবিশ্বাস ও আস্থা নিয়ে খেলে মাসল ক্র্যাম্প হওয়ায় পরদিন সুস্থ হয়ে ফ্রেশ হয়ে ব্যাটিংয়ে নেমে ওই ৪২ রানে আউট হয়ে দলের ছন্দপতন ডেকে আনেন।
আর গতকাল শুক্রবার দুপুরে দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাটিংয়ে নেমে দ্বিতীয় বলেই ক্যারিবীয় অধিনায়ক চেজের ঝুলিয়ে দেওয়া বলে প্রলুব্ধ হয়ে মারতে গিয়ে মিড অনের ১৫ গজ দূরে ক্যাচ দিয়ে আরও একবার দলকে বিপদে ফেলে বিদায় নেন হৃদয়। মোদ্দা কথা, হৃদয়ের দায়িত্বহীন দুটি শট প্রথম ও দ্বিতীয় ইনিংসের ছন্দপতনের অন্যতম বড় কারণ।
খুব স্বাভাবিকভাবেই অমন বাজেভাবে দুই-দুইবার আউট হওয়া ও দায়িত্বহীন শট খেলে সমালোচকদের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন হৃদয়।
আজ শনিবার বিকেলে টেস্ট হারের পর সংবাদ সম্মেলনে কথা বলতে এসে হৃদয়ের অ্যাপ্রোচ নিয়ে কড়া প্রশ্নের মুখোমুখি হন টাইগার ক্যাপ্টেন শান্তও। সাংবাদিকরা বারবার হৃদয় ইস্যু তুলে ধরে টাইগার অধিনায়কের ভাষ্য জানতে চান। অধিনায়ক হিসেবে হৃদয়ের আউট হওয়ার ধরনটা কতটা গ্রহণযোগ্য মনে হয়েছে? তার সঙ্গে কথা বলেছেন কিনা?
এমন সব প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ অধিনায়ক শান্ত অবশ্য পুরো সময়জুড়েই হৃদয়কে আগলে রাখার চেষ্টা করেছেন। বোঝানোর চেষ্টা করেন, একেকজনের খেলার ধরন একেক রকম। দেখে যেমনই লাগুক না কেন, হৃদয়ের খেলার ধরনটাই আসলে অমন।
শনিবার পড়ন্ত বিকেলে টেস্ট হারের পর সংবাদ সম্মেলনে হৃদয়কে নিয়ে শান্তর বক্তব্য ছিল এরকম, ‘হ্যাঁ, হৃদয়ের সঙ্গে কথা হয়েছে। আমার মনে হয়, সে বুদ্ধিমান ছেলে। খুব তাড়াতাড়ি নিজের ভুলত্রুটি শুধরে নেওয়ার চেষ্টা করে। আমার ধারণা, এরপর এমন পরিস্থিতি এলে হৃদয় নিজেকে শুধরে পরিস্থিতি অনুযায়ী খেলবে।’
টাইগার ক্যাপ্টেন আরও বলেন, ‘আমরা আসলে কাউকেই আলাদাভাবে চিহ্নিত করতে চাই না। আর আমার মনে হয় না, একজন ব্যাটারকে চারটি ইনিংস দেখে মূল্যায়ন করা উচিত বা যুক্তিযুক্ত।’
হৃদয় সম্পর্কে অধিনায়ক শান্তর শেষ কথা, ‘আমরা সবাই জানি হৃদয় কতটা ভালো প্লেয়ার এবং সাদা বলে কতটা ক্যাপাবল। এ ছাড়া ও যখন লাল বলে ফার্স্ট ক্লাস খেলে, তখনো লম্বা ইনিংস খেলে।’
‘আমি তাই টেস্টে তার চার ইনিংস দেখেই চূড়ান্ত মন্তব্য করতে চাই না। আমার বিশ্বাস, আগামীতে হৃদয় টেস্টে খুব ভালোভাবে কামব্যাক করবে। তাই এটা নিয়ে খুব বেশি চিন্তা করছি না। কারণ, সে এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছে।’
